এ বছর ভারত-দক্ষিণ কোরিয়া বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্বের দশম বার্ষিকী। তবে উন্নত কূটনৈতিক সম্পর্ক ছাড়া এখন পর্যন্ত এই অংশীদারিত্ব থেকে ভারতের কী বাস্তব সুফল মিলেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ানদের কাছ থেকে কি ভারত শিখতে পারে কীভাবে প্রযুক্তি দুনিয়ার নেতৃত্বে ওঠা যায়? সাম্প্রতিক এক বিজ্ঞাপনে দক্ষিণ কোরিয়ার গাড়ি প্রস্তুতকারক হুন্দাই দাবি করেছে, “হুন্দাই সোনাটা যা করতে পারে, হোন্ডা অ্যাকর্ড তা পারে না।” দক্ষিণ কোরিয়ার সাফল্যের পেছনে বড় কারণ ছিল জাপানের সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ১৯৭০-এর দশকে আমেরিকায় জাপানি গাড়ির আগমন পুরো অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রিকে বদলে দেয়।
হোন্ডা, টয়োটা, নিশান, মিতসুবিশি, সুজুকি-র মতো ব্র্যান্ড বাজারে আধিপত্য বিস্তার করে এবং মার্কিন সংস্থাগুলোকে মানোন্নয়নে বাধ্য করে। ভোক্তা ইলেকট্রনিক্স ক্ষেত্রেও জাপানিরা একসময় প্রভাব বিস্তার করেছিল। সনি, প্যানাসনিক, তোশিবা, শার্প ইত্যাদি ব্র্যান্ড আমেরিকান বাজার দখল করেছিল। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকের পর জেনিথ দেউলিয়া হয় এবং আরসিএ বিক্রি হয়ে যায়। এই ধাক্কা দেয় কোরিয়ানদের উত্থানের জায়গা।শুরুতে হুন্দাই, দাইউ, কিয়া–র মতো গাড়ি নিয়ে উপহাস করা হলেও, পরবর্তীতে তারা ডিজাইন ও প্রযুক্তিতে ব্যাপক উন্নতি ঘটায়। আজ হুন্দাই সোনাটা জনপ্রিয় গাড়ি এবং জেনেসিস একটি বিলাসবহুল ব্র্যান্ড। টেলিভিশন ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স বাজারেও কোরিয়ানরা জাপানিদের সরিয়ে দিয়েছে। তারা ফ্ল্যাট প্যানেল এলসিডি প্রযুক্তি বিকাশ করে বাজার দখল করে নেয়, যেখানে জাপানিরা প্লাজমা, সিআরটি ইত্যাদিতে বাজি ধরেছিল।
স্যামসাং আজ মোবাইল বাজারে অ্যাপল-এর প্রতিদ্বন্দ্বী, আবার সেমিকন্ডাক্টর ও ব্যাটারি প্রযুক্তিতেও নেতৃত্ব দিচ্ছে। জাহাজ নির্মাণ, মেডিকেল যন্ত্রপাতি, ভারী যন্ত্রশিল্প–সবেতেই কোরিয়ানদের উপস্থিতি স্পষ্ট।১৯৯০-এর দশকে সনি-তে কাজ করার সময় লেখক দক্ষিণ কোরিয়া সফরে যান এবং কোরিয়ান ইঞ্জিনিয়ারদের তীব্র কৌতূহল ও শেখার আগ্রহ লক্ষ্য করেন। জাপানিদের তুলনায় কোরিয়ান ইঞ্জিনিয়াররা উচ্চশিক্ষিত, অনেকেই স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। কোম্পানিগুলো কর্মীদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করত, যা উৎপাদনশীলতা বাড়াত। কোরিয়ান সরকারের রপ্তানিমুখী নীতি তাদের বিশ্ববাজারে নবম বৃহত্তম রপ্তানিকারক করেছে।
প্রযুক্তির বাইরেও কোরিয়ানরা সংস্কৃতি ও ক্রীড়াক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে—‘প্যারাসাইট’ অস্কার জয়, ‘স্কুইড গেম’-এর এমি সাফল্য, কেপপ এবং কে-ড্রামার বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা তার প্রমাণ।কোরিয়ানদের সাফল্যের পেছনে রয়েছে জাতীয় গৌরববোধ, প্রতিযোগিতায় সাহসী মানসিকতা, অধ্যবসায়, উচ্চশিক্ষার প্রতি বিশ্বাস, সৃজনশীলতার স্বীকৃতি এবং সরকারের অনুকূল নীতি। ভারত চাইলে এই পথ অনুসরণ করতে পারে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক অতীত থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ভারতেরও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে, বিশেষত যখন শ্রম খরচের দিক থেকে ভারত চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম।
