২০২৬-এর নির্বাচনে কতটা প্রাসঙ্গিক?
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই জাতিগত ও সামাজিক সমীকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সেই সমীকরণে নতুনভাবে আলোচনায় উঠে এসেছে কৈবর্ত-মাহিষ্য জনগোষ্ঠীর সংগঠন “বঙ্গীয় কৈবর্ত মাহিষ্য ঐক্য মঞ্চ” এবং এর সভাপতি সিদ্ধানন্দ পুরকাইতের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এক বিস্তৃত সামাজিক আন্দোলন। আগামী ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে এই আন্দোলনের রাজনৈতিক তাৎপর্য কতটা—সেই প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
প্রায় দুই দশক ধরে সিদ্ধানন্দ পুরকাইত ও তাঁর সহযোগীরা কৈবর্ত-মাহিষ্য সমাজের ঐতিহাসিক পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা এবং অধিকার নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে আসছেন। এই দীর্ঘ সময়ে সমাজের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। বিভিন্ন সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সংগঠনের মাধ্যমে গ্রাম থেকে জেলা স্তর পর্যন্ত এক ধরনের সামাজিক নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। বহু মানুষের মতে, এই কাজের ফলে কৈবর্ত-মাহিষ্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিজেদের ইতিহাস ও রাজনৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে নতুন করে উপলব্ধি তৈরি হয়েছে।
সংগঠনের দাবি অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে সমাজের যুবসমাজের মধ্যেও শিক্ষা ও সামাজিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ, সমবায় কার্যক্রম এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে একটি ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠা সামাজিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলায়—বিশেষ করে পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, হাওড়া, হুগলি, নদীয়া ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন অঞ্চলে কৈবর্ত-মাহিষ্য ভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এই জনগোষ্ঠীর সমর্থন পাওয়ার জন্য সক্রিয় হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দলে থাকা কৈবর্ত-মাহিষ্য নেতারাও দীর্ঘদিনের বঞ্চনার প্রশ্নে সরব হতে শুরু করেছেন বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।
এদিকে বঙ্গীয় কৈবর্ত মাহিষ্য ঐক্য মঞ্চের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা উদ্যোগের কথাও সামনে এসেছে। সংগঠনের রিসার্চ টিম ইতিমধ্যেই রাজ্যের প্রায় ১০০টি কৈবর্ত-মাহিষ্য অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে সমীক্ষা সম্পন্ন করেছে বলে জানা গেছে। সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, যদি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি এই কেন্দ্রগুলিতে যথাযথভাবে হিন্দু ওবিসি ও কৈবর্ত-মাহিষ্য সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না করে, তাহলে প্রায় ৫০টি আসনে নির্দল প্রার্থী দেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে সংগঠনটি এখনও সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করতে আগ্রহী নয় বলেই দাবি করেছেন মঞ্চের নেতৃত্ব। ইতিমধ্যে কয়েকটি ছোট রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে নির্বাচনী প্রতীক দেওয়ার প্রস্তাব এলেও তা গ্রহণ করা হবে না বলে জানানো হয়েছে। সংগঠনের বক্তব্য, তাদের মূল লক্ষ্য সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি।
অভ্যন্তরীণ সূত্রে আরও জানা গেছে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি তালিকাও প্রস্তুত রয়েছে। এই তালিকায় ডাক্তার, অধ্যাপক, শিক্ষক এবং আইনজীবীদের মতো পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানা যায়। সংগঠনের দাবি, প্রতিটি প্রার্থীই স্থানীয় “ভূমিপুত্র”, উচ্চশিক্ষিত এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির মানুষ।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, যদি এই সামাজিক সংগঠনটি রাজ্যব্যাপী আরও সুসংগঠিত রূপ পায়, তবে ভবিষ্যতে এটি একটি উল্লেখযোগ্য “সুইং ভোট” শক্তি হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গের বহু আসনে নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এমনকি দীর্ঘমেয়াদে বিহার বা উত্তরপ্রদেশের মতো জাতি-ভিত্তিক রাজনৈতিক সমীকরণও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুনভাবে দেখা যেতে পারে—এমন আশঙ্কা বা সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছে রাজনৈতিক মহলে।
তবে এই আন্দোলনের সামনে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। কৈবর্ত ও মাহিষ্য সমাজের অভ্যন্তরীণ বিভাজন, গ্রাম-শহরের পার্থক্য এবং পেশাভিত্তিক ভিন্নতা এখনও পূর্ণ ঐক্য গড়ে ওঠার পথে বাধা বলে মনে করা হয়। পাশাপাশি বড় রাজনৈতিক দলগুলির ভোট বিভাজনের কৌশলও এই সামাজিক শক্তির প্রভাব কমাতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সিদ্ধানন্দ পুরকাইতের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক আন্দোলন ইতিমধ্যেই কৈবর্ত-মাহিষ্য সমাজের মধ্যে নতুন সচেতনতার জন্ম দিয়েছে। সেই সামাজিক শক্তি আগামী নির্বাচনে কতটা রাজনৈতিক রূপ নেবে, তা এখন দেখার বিষয়।
লোকমাতা রানি রাসমণির আদর্শে অনুপ্রাণিত এই জনগোষ্ঠীর নবজাগরণ আদৌ পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী সমীকরণে নতুন অধ্যায় লিখতে পারে কি না—তার উত্তর মিলবে সম্ভবত আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই।
