দিল্লি— যন্তর মন্তরকে কেন্দ্র করে ‘যন্তর মন্তর ২.০’ (Jantar Mantar 2.0 Protest) বিক্ষোভ কর্মসূচির জেরে দিল্লিতে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ব্যারিকেড এবং রেল ও মেট্রো পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার ঘটনায় কেন্দ্রীয় সরকার ও দিল্লি পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of India)। বিক্ষোভস্থলে যাতায়াতের পথে বাধা, ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা এবং সাধারণ মানুষের চলাচলে বিধিনিষেধ নিয়ে দায়ের হওয়া মামলায় শীর্ষ আদালত ব্যারিকেড বসানোর বিষয়টি পর্যালোচনা করার নির্দেশ দিয়েছে। অপ্রয়োজনীয় ব্যারিকেড সরিয়ে মানুষের যাতায়াত স্বাভাবিক রাখার কথাও জানিয়েছে আদালত।
বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী (Justice Joymalya Bagchi) এবং বিচারপতি ভি মোহনার (Justice V Mohana) বেঞ্চ মামলাটির শুনানি করে। আদালতের বক্তব্য, নিরাপত্তার প্রয়োজন থাকলেও তার জন্য সাধারণ মানুষের চলাচল ও প্রয়োজনীয় পরিষেবা অকারণে ব্যাহত করা যায় না। রাস্তায় ব্যারিকেড বসানোর যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখতে হবে। একই সঙ্গে আদালত চত্বর এবং তার আশপাশে যাতায়াতের পথও বাধামুক্ত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

‘যন্তর মন্তর ২.০’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শনিবার রাজধানী দিল্লিতে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। বিক্ষোভে বড় জমায়েতের আশঙ্কায় শুক্রবার রাত থেকেই বিভিন্ন এলাকায় পুলিশি তৎপরতা বাড়ানো হয়। একাধিক জায়গায় ব্যারিকেড বসানো হয়। অভিযোগ, যন্তর মন্তর সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবাও ব্যাহত হয়। পাশাপাশি দিল্লির একাধিক মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা এবং দিল্লিগামী কিছু ট্রেন বাতিল করার ঘটনাও সামনে আসে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও দৈনন্দিন কাজকর্মে সমস্যা তৈরি হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানানো হয়। এর আগে শুনানিতে শীর্ষ আদালত জানিয়েছিল, নিরাপত্তার যুক্তিতে সাধারণ মানুষকে প্রয়োজনীয় পরিষেবা থেকে বঞ্চিত করা যায় না। শনিবার মেট্রো ও ট্রেন পরিষেবা পুরোপুরি বন্ধ না রাখার বিষয়েও আদালত নির্দেশ দিয়েছিল বলে মামলার প্রেক্ষাপটে উল্লেখ করা হয়েছে। রবিবারের বিশেষ শুনানিতে ব্যারিকেড, যাতায়াতের স্বাধীনতা এবং পুলিশের ক্ষমতা প্রয়োগের সীমা নিয়ে ফের প্রশ্ন ওঠে।
মামলাকারীর পক্ষে সওয়াল করেন আইনজীবী কপিল সিব্বল। তাঁর বক্তব্য, সংবিধান নাগরিকদের শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার দিয়েছে। কিন্তু আন্দোলনকারীদের নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলে পৌঁছোতে বাধা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর আরও দাবি, কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে টেনেহিঁচড়ে পুলিশ ভ্যানে তোলা হয়েছে এবং কাউকে কাউকে বেআইনিভাবে আটক করা হয়েছে। এই অভিযোগগুলির সত্যতা আদালতে বিচারাধীন; এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি।
অন্যদিকে, কেন্দ্রের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা জানান, বিক্ষোভের জন্য পুলিশের অনুমতি নেওয়া হয়নি। তার পরিপ্রেক্ষিতে বেঞ্চ জানায়, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে কোনও বিরোধ নেই। তবে সেই কর্মসূচি আইন মেনে করতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশের বিধিনিষেধ এবং সংবিধানপ্রদত্ত অধিকারের মধ্যে সম্পর্ক খতিয়ে দেখার কথাও জানিয়েছে আদালত।
বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও একাধিক অভিযোগ উঠেছে। অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, বেআইনি আটক এবং পরিচয়-নামফলক ছাড়া পুলিশকর্মীদের মোতায়েন থাকার অভিযোগের জবাব দিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। আদালত এই অভিযোগগুলিকে বিধিবদ্ধ দায়িত্ব পালনের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছে। ফলে শুধু নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাই নয়, সেই ব্যবস্থা কতটা আইনসম্মত এবং নাগরিকদের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকছে, তা-ও বিচারাধীন।
শনিবার সুপ্রিম কোর্ট চত্বর ও তার আশপাশে জমায়েত নিয়ন্ত্রণে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছিল বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন তোলে বিচারপতি বাগচীর বেঞ্চ। আদালত চত্বরের ভিতরে বা আশপাশে ওই ধারা জারির নির্দেশ-সংক্রান্ত বোর্ড থাকলে তা সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। সুপ্রিম কোর্ট ও অন্যান্য আদালতে যাতায়াতের পথে যাতে কোনও বাধা না থাকে, তা নিশ্চিত করতেও পুলিশকে বলা হয়েছে।
মামলাটির পরবর্তী শুনানি মঙ্গলবার। সেদিন ব্যারিকেডের প্রয়োজনীয়তা, পুলিশের ক্ষমতা প্রয়োগ, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং সাধারণ মানুষের চলাচলের অধিকার নিয়ে বিস্তারিত শুনানি হওয়ার কথা। আদালতের পর্যবেক্ষণ ও পরবর্তী নির্দেশের উপর নির্ভর করবে দিল্লিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা শিথিল করা হবে এবং যাতায়াত ও যোগাযোগ পরিষেবা স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
