সংবাদ কলকাতা: মহালয়ার পুণ্যলগ্নে কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দুর্গাপুজোর সূচনা করল রাজ্য সরকার। ঢাকের বোল, আদিবাসী নাচ, বাংলার লোকসংস্কৃতি, সংগীত এবং আধুনিক আলোকপ্রযুক্তির মেলবন্ধনে সাজানো হয়েছিল এই বিশেষ আয়োজন। রেড রোড থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় ইডেনের উদ্দেশে রওনা দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত-সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক জগতের প্রতিনিধিরা। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন রাজ্যপাল আর এন রবি।
রাজ্য সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি এবং পর্যটন দপ্তরের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বাংলার ২৩টি জেলার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তুলে ধরা হয়। দার্জিলিং থেকে পুরুলিয়া, বিভিন্ন জেলার নাচ, গান ও লোকশিল্পের পরিবেশনায় উৎসবের আবহ তৈরি হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার, রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য, মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল এবং জুন মালিয়া, স্বপন দাশগুপ্ত, সুখেন্দুশেখর রায় ও তসলিমা নাসরিন-সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
তিন হাজার ড্রোনে আকাশে দুর্গার আবাহন
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল প্রায় তিন হাজার ড্রোনের আলোক প্রদর্শনী। আকাশে ড্রোনের আলো ব্যবহার করে ফুটিয়ে তোলা হয় দেবী দুর্গার আগমনের দৃশ্য। পাশাপাশি আয়োজন করা হয় ত্রিমাত্রিক আলোকচিত্র প্রদর্শনী। আয়োজকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্গাপুজোর এই বিশেষ মুহূর্তকে দেশের বাইরের দর্শকদের কাছেও পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা, আমেরিকার বস্টন এবং নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কোয়ারে এই অনুষ্ঠান দেখানোর পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।
ঢাকের বাদ্যি, শঙ্খধ্বনি এবং উলুধ্বনির মাধ্যমে বাঙালির চিরাচরিত আগমনী আবহকে আরও বর্ণময় করে তোলা হয়। অনুষ্ঠানে প্রায় তিন হাজার ঢাকি এবং এক হাজার মহিলার অংশগ্রহণের আয়োজন করা হয়েছিল বলে জানানো হয়। এই আয়োজনের মাধ্যমে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে (Guinness World Records) নাম তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রীর হাতে রেকর্ডের শংসাপত্র তুলে দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে রেকর্ডের নির্দিষ্ট বিভাগ ও চূড়ান্ত স্বীকৃতির বিষয়টি আনুষ্ঠানিক নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
মঞ্চে শান, লগ্নজিতা, কৌশিকী ও অন্তরা
সংগীতের আয়োজনেও ছিল বৈচিত্র্য। শান, লগ্নজিতা চক্রবর্তী, কৌশিকী চক্রবর্তী এবং অন্তরা মিত্রের পরিবেশনার পাশাপাশি অনুষ্ঠানে অংশ নেয় বাংলা ব্যান্ড দোহার। শান্তনু মৈত্র ও তাঁর দলের পরিবেশনা এবং দেবর্ষি ভট্টাচার্য-সহ অন্যান্য শিল্পীর যন্ত্রসংগীত অনুষ্ঠানের আকর্ষণ বাড়ায়। শিল্পী ইমন চক্রবর্তীকেও অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।
রেড রোড থেকে ইডেন পর্যন্ত শোভাযাত্রায় মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে পা মেলান ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত-সহ একাধিক অভিনেতা-অভিনেত্রী, ক্রীড়াবিদ এবং পদ্ম সম্মানপ্রাপক। ঢাকের তালে ও লোকশিল্পীদের পরিবেশনায় শহরের বিভিন্ন প্রান্তে উৎসবের আবহ তৈরি হয়। একই সময়ে রাজ্যের বিভিন্ন জেলাতেও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দুর্গাপুজোর সূচনা হয়।
পুজোর অনুদান ও সরকারি ছাড়ের ঘোষণা
অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, পঞ্জিকা ও শাস্ত্র মেনে দুর্গাপুজো আয়োজনের উপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। তাঁর বক্তব্য, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সনাতনী সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। পুজো কমিটিগুলিকে রবিবার থেকে এক লক্ষ টাকা করে অনুদান দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেন তিনি।
তবে কলকাতার কয়েকটি বড় পুজো কমিটি অনুদানের অর্থ নিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছে বলে জানানো হয়েছে। তাদের তরফে ওই অর্থ গ্রামীণ এবং মহিলা পরিচালিত পুজো কমিটিগুলিকে দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। পুজো উপলক্ষে বিদ্যুতের শুল্ক এবং দমকলের অনুমোদন ফি মকুবের কথাও জানান মুখ্যমন্ত্রী। কলকাতায় সিইএসসি এবং রাজ্যের অন্যত্র পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থা পুজো কমিটিগুলির কাছ থেকে বিদ্যুতের জন্য অর্থ নিচ্ছে না বলেও তিনি দাবি করেন।
নতুন পুজোর অনুমতি ও নিরঞ্জনের সময়সীমা
আগামী বছরের জন্য নতুন দুর্গাপুজোর অনুমোদন দেওয়ার কথাও ঘোষণা করা হয়। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, কলকাতা পুলিশের আওতায় ৪০০টি এবং রাজ্য পুলিশের আওতায় ১২ হাজার নতুন পুজোর অনুমোদনের পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে ১২ হাজার ৪০০টি নতুন পুজোর কথা উল্লেখ করেন তিনি।
এ ছাড়া সেরা প্রতিমা, সেরা পুজো এবং পরিবেশ সচেতনতার জন্য বিশেষ পুরস্কার দেওয়ার কথা জানানো হয়। পুজোর অনুমতি পেতে এ বার কাউকে কলকাতা হাই কোর্টে যেতে হয়নি বলেও দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রতিমা নিরঞ্জনের ক্ষেত্রে আগামী ২৪ অক্টোবরের মধ্যে প্রক্রিয়া শেষ করার নির্দেশের কথাও উঠে আসে।
দুর্গাপুজোকে আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিত করে তোলার প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে ধন্যবাদ জানান। ইউনেস্কোর স্বীকৃতি এবং ২০২৩ সালে ভিক্টোরিয়ায় দুর্গাপুজোর উদ্বোধনের প্রসঙ্গও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
কলকাতা ছাড়াও একাধিক জেলায় উৎসব
ইডেনের মূল অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দুর্গাপুর, শিলিগুড়ি, কৃষ্ণনগর, কোচবিহার, মালদহ, বহরমপুর এবং দিঘায় মহাসপ্তমী পর্যন্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে বলে জানানো হয়। গঙ্গার দুই পাড় সাজিয়ে তোলা এবং গঙ্গা আরতির ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে দেবীবন্দনা ও মন্ত্রোচ্চারণ করেন মুখ্যমন্ত্রী। দেশ গঠনের প্রসঙ্গে তিনি ২০৪৭ সালের মধ্যে বিকশিত ভারত গড়ার লক্ষ্যে শক্তি প্রার্থনা করেন এবং রাজ্যবাসীকে দুর্গাপুজোর শুভেচ্ছা জানান।
যান চলাচলে বিধিনিষেধ
ইডেন গার্ডেন্সে অনুষ্ঠান ঘিরে কলকাতার একাধিক রাস্তায় পণ্যবাহী গাড়ি চলাচলে বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছিল। কলকাতা ট্র্যাফিক পুলিশের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, শনিবার ভোর ৪টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত স্ট্র্যান্ড রোড এবং সেন্ট জর্জেস গেট রোডের নির্দিষ্ট অংশে পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়। রাজা উডমন্ট স্ট্রিট ও হেস্টিংস ক্রসিংয়ের মধ্যবর্তী অংশেও এই বিধিনিষেধ কার্যকর ছিল।
মহালয়ার এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলার লোকসংস্কৃতি, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং আধুনিক প্রযুক্তিকে একই মঞ্চে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে অনুষ্ঠানের দর্শকসংখ্যা, গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের স্বীকৃতি এবং বিভিন্ন সরকারি ঘোষণার বাস্তবায়ন সম্পর্কে চূড়ান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
