নতুন দিল্লি: যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শনিবার দিল্লিতে ব্যাপক ধরপাকড় চালাল পুলিশ। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার আগেই একের পর এক প্রতিবাদকারী, রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক এবং সমাজমাধ্যমের কনটেন্ট নির্মাতাদের আটক করে বিভিন্ন অস্থায়ী আটককেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ। আটক ব্যক্তিদের তালিকায় রয়েছেন চার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, পিনারাই বিজয়ন এবং মানিক সরকার। পাশাপাশি অভিনেতা রাজ জুৎসি এবং একাধিক সাংবাদিককেও আটক করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। পুলিশের এই পদক্ষেপ ঘিরে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে বিরোধীরা।
প্রায় ১৪ বছর পর রাজধানীতে এমন ব্যাপক প্রতিবাদ এবং তার পাশাপাশি পুলিশি তৎপরতার ছবি দেখা গেল বলে দাবি সংশ্লিষ্ট মহলের। শনিবার সকাল থেকেই যন্তর মন্তর এবং সংলগ্ন এলাকায় পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়। সন্দেহভাজনদের আটক করে বাস ও পুলিশের ভ্যানে চাপিয়ে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বলে অভিযোগ। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ বিক্ষোভে যোগ দিতে এসেছিলেন, কেউ খবর সংগ্রহ করছিলেন, আবার কয়েকজনের দাবি, তাঁরা অন্য কাজে বেরিয়ে পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন।
বিরোধীদের অভিযোগ, বিক্ষোভের পরিসর সীমিত রাখতেই পুলিশ এমন পদক্ষেপ করেছে। কংগ্রেস মুখপাত্র পবন খেরা পুলিশের এই ভূমিকা নিয়ে কটাক্ষ করেন। তাঁর বক্তব্য, সরকারের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে তারা ভয় পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অতীতের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘একটা সময়ে প্রধানমন্ত্রী বলতেন, ডর আচ্ছা হ্যায়। এখন আমরাও বলছি, ইয়ে ডর আচ্ছা হ্যায়।’ যদিও পুলিশি পদক্ষেপের পিছনে প্রশাসনের নির্দিষ্ট যুক্তি কী, তা নিয়ে বিস্তারিত সরকারি বক্তব্য এই বিবরণে পাওয়া যায়নি।
১৩টি জেলায় অস্থায়ী আটককেন্দ্র
বিক্ষোভকারীদের রাখার জন্য দিল্লির ১৩টি জেলায় অস্থায়ী আটককেন্দ্র তৈরি করা হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। উত্তর দিল্লির ছত্রশাল স্টেডিয়াম এবং বাওয়ানার রাজীব গান্ধী স্টেডিয়াম ছিল সেই তালিকায়। এ ছাড়াও শালিমার বাগের একটি সরকারি স্কুলকেও আটককেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ।
শনিবার দুপুরে ছত্রশাল স্টেডিয়ামে খেলোয়াড়দের অনুশীলন চলছিল। সেই সময় একের পর এক পুলিশের গাড়িতে করে আটক ব্যক্তিদের সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। স্টেডিয়ামের ভিতরে তাঁদের পরিচয় এবং অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করছিল পুলিশ। প্রবেশপথের কাছে বড় তাঁবুতে কর্তব্যরত পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশবাহিনীর সদস্যদের জন্য খাবার, পানীয় জল এবং জলখাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।
যন্তর মন্তর রোডের শুরুতে কেরল হাউসের কাছ থেকে কেরলের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নকে আটক করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে। পরে তাঁকে ছত্রশাল স্টেডিয়াম চত্বরে নিয়ে যাওয়া হয়। আটক ব্যক্তিদের কোথায় রাখা হবে, তা নিয়ে বারবার সিদ্ধান্ত বদল করা হচ্ছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সিপিএম কর্মী এ আর সিন্ধুর দাবি, আটক হওয়ার পর তাঁদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘোরানো হচ্ছিল। পরবর্তী গন্তব্য হিসেবে বুড়ারির কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে, তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা ছিল না বলে অভিযোগ তাঁর। আটক মহিলাদের পোশাক ছিঁড়ে যাওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। তবে এই অভিযোগগুলির বিষয়ে পুলিশের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
আটককেন্দ্রেও প্রতিবাদের স্লোগান
শনিবার সকাল থেকেই ছত্রশাল স্টেডিয়ামে একের পর এক বাস ও পুলিশের গাড়ি ঢুকতে দেখা যায়। সকাল ১১টার আগে সেখানে পৌঁছনো কয়েকজনকে পরে আবার বাসে তুলে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়। একটি ভ্যানে অভিনেতা রাজ জুৎসি-সহ চার-পাঁচজন আটক ব্যক্তি ছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
পুলিশি নজরদারি এবং আটক করার প্রক্রিয়া চললেও বাসের ভিতর থেকে প্রতিবাদীদের স্লোগান শোনা যাচ্ছিল। ‘ভোট চোর গদ্দি ছোড়’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে সংশ্লিষ্ট এলাকা। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, তাঁদের আটক করে দূরে সরিয়ে দিলেও প্রতিবাদের আওয়াজ বন্ধ করা যায়নি।
আটক সাংবাদিকদের দাবি, ফোনও নিয়ে নেওয়া হয়
পুলিশি অভিযানে সাংবাদিকদের আটক করার ঘটনাও নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। নিউজলন্ড্রির সাংবাদিক আনমোল প্রীতমের দাবি, অন্তত ১৫ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা চারজন একসঙ্গে নয়াদিল্লি রেলস্টেশনে খবর সংগ্রহ করছিলেন। সেই সময় পুলিশ তাঁদের আটক করে বাসে তুলে ছত্রশাল স্টেডিয়ামে নিয়ে যায়।
একই বাসে থাকা অন্য এক ব্যক্তির অভিযোগ, আটক করার সময় তাঁদের মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়া হয়েছিল। বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের আটক করার ঘটনায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে দিল্লি পুলিশ সূত্রে পরে জানানো হয়, আটক নিউজলন্ড্রি এবং স্ক্রলের সাংবাদিকদের দুপুরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে সাংবাদিকদের আটক করার ঘটনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলেও তাঁদের মুক্তির খবরও সামনে আসে।
হাসপাতালে যাওয়ার পথেও আটক করার অভিযোগ
বাওয়ানার রাজীব গান্ধী স্টেডিয়ামেও আটক ব্যক্তিদের রাখা হয়েছিল। সেখানে অ্যাথলেটিক্সের একটি অংশ ঘিরে তাঁদের রাখার ব্যবস্থা করা হয়। কর্তব্যরত পুলিশকর্মীদের বক্তব্য অনুযায়ী, সকাল ১১টার মধ্যে সেখানে ১৭ জন পুরুষকে নিয়ে আসা হয়েছিল।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে এক মধ্যবয়স্ক ব্যক্তির দাবি, বিক্ষোভের সঙ্গে তাঁর কোনও সম্পর্ক ছিল না। এক আত্মীয়কে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় মধ্য দিল্লির মহাদেব রোড থেকে তাঁকে আটক করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। কেন সেখানে ছিলেন, তা জানতে চাওয়ার পরই তাঁকে পুলিশের গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়েছিল বলে তাঁর দাবি।
এ ছাড়া দুই কনটেন্ট নির্মাতার অভিযোগ, যন্তর মন্তরের কাছে সমাজমাধ্যমের জন্য রিল তৈরি করার সময় তাঁদের আটক করা হয়। অর্থাৎ, বিক্ষোভে সরাসরি অংশগ্রহণকারী এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত অন্য ব্যক্তিদের মধ্যে পুলিশ কতটা স্পষ্ট পার্থক্য করেছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর
শনিবারের ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে বিরোধী শিবিরের বক্তব্য, ব্যাপক ধরপাকড়ের মাধ্যমে প্রতিবাদকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা হয়েছে। তাঁদের মতে, সাংবাদিক, কনটেন্ট নির্মাতা এবং সাধারণ মানুষের আটকের অভিযোগ প্রশাসনের পদক্ষেপ নিয়ে আরও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, আটক করার ক্ষেত্রে পুলিশের নির্দিষ্ট কারণ, প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল এবং কতজনকে শেষ পর্যন্ত মুক্তি দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য সামনে না এলে গোটা অভিযানের প্রকৃতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো কঠিন। আটক ব্যক্তিদের একাংশের অভিযোগ এবং পুলিশের তরফে পাওয়া সীমিত বক্তব্যের মধ্যে এখনও একাধিক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
শনিবার দুপুর পর্যন্ত পাওয়া ঘটনাচিত্রে স্পষ্ট, যন্তর মন্তরের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে বড় আকারের পুলিশি অভিযান চলেছে। আটক ব্যক্তিদের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া, সাংবাদিকদের আটক করা এবং সাধারণ মানুষের হয়রানির অভিযোগ রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও বাড়িয়েছে। তবে এই সমস্ত অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এবং পুলিশের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য ছাড়া অভিযানের প্রতিটি দিক সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়।
