এক এক করে ২৪টি দিন কেটে গিয়েছে। তবু আনন্দপুরের নাজিরাবাদের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে উদ্ধার হওয়া দেহাংশগুলির কাউকেই এখনও শনাক্ত করা যায়নি। পরিবারগুলির হাতে এসে গিয়েছে ১০ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণের চেক। কিন্তু যাঁদের মৃত্যুর জন্য এই আর্থিক সহায়তা, তাঁদের মৃত্যুর সরকারি নিশ্চয়তাই এখনও মেলেনি। ফলে পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম নিয়েও ধন্দে পড়েছেন পরিজনেরা।
গত ২৫ জানুয়ারি রাতে পর পর দু’টি গুদামে আগুন লাগে। ভিতরে আটকে পড়েছিলেন রাতের শিফ্টে থাকা কর্মী ও নিরাপত্তারক্ষীরা। কেউ দেওয়াল ভাঙার চেষ্টা করেছিলেন, কেউ শেষ বার ফোন করেছিলেন বাড়িতে। দীর্ঘ সময়ের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে দমকল। পরে ভস্মীভূত গুদাম থেকে একের পর এক দেহাংশ উদ্ধার করে পুলিশ। কিন্তু কোন দেহাংশ কার, তা বোঝা যায়নি।
মোট ২৭টি নিখোঁজ ডায়েরি হয়েছে। বারুইপুর মহকুমা পুলিশ দেহাংশগুলি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছে। ২৭টি পরিবারের কাছ থেকে নমুনাও সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু মৃতের সংখ্যা এখনও নিশ্চিত নয়।
রাজ্য সরকার মৃতদের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণের ঘোষণা করেছিল। একটি গুদাম ছিল Wow! Momo সংস্থার। তারা পৃথক ভাবে তিন কর্মীর পরিবারকে আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়। ইতিমধ্যে বহু পরিবারের হাতে চেক পৌঁছেছে— কোথাও জেলাশাসক, কোথাও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে। কিন্তু দেহ না মিলেই ক্ষতিপূরণ দেওয়ায় প্রশ্ন উঠছে।
মেদিনীপুরের নিরঞ্জন মণ্ডল অগ্নিকাণ্ডে ভাই ও ছেলেকে হারিয়েছেন বলে দাবি। তাঁর কথায়, “টাকা তো পেলাম, কিন্তু দেহ তো পেলাম না। আগে দেহ দিক, তার পর সব করব।” পরিবার ইতিমধ্যে স্থানীয় পুরোহিতের সঙ্গে আলোচনা করে ১৪ মার্চ শ্রাদ্ধশান্তির দিন স্থির করেছে, যদিও পুলিশের ফোনের অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা।
ঝাড়গ্রামের রবীশ হাঁসদার পরিবারেও একই অবস্থা। নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে কাজ করতেন রবীশ। দেহ না পাওয়ায় এখনও অশৌচ পালন করছেন পরিবারের সদস্যেরা। রান্নাও হচ্ছে না তাঁদের বাড়িতে; আত্মীয়দের বাড়ি থেকে খাবার আসছে।
অন্য দিকে, মেদিনীপুরের জন্মেজয় দিন্ডার দাবি, ১০ লক্ষ টাকার চেক পেলেও ডিএনএ পরীক্ষার পর আর কোনও আর্থিক সহায়তা মিলবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। চেকে সংস্থার পাশাপাশি গুদাম-মালিকের নামও রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
পুলিশ সূত্রে দাবি, এই ধরনের ঘটনায় ডিএনএ পরীক্ষায় সময় লাগে। দেহাংশগুলির অবস্থা এমন যে, পরীক্ষার ফল ছাড়া শনাক্তকরণের অন্য উপায় নেই। রিপোর্ট এলেই বহু প্রশ্নের উত্তর মিলবে— ২৫ জানুয়ারি রাতে গুদামে ঠিক কত জন ছিলেন, ২৭ জনের বাইরেও কেউ ছিলেন কি না, কেউ পালাতে পেরেছিলেন কি না— সবই পরিষ্কার হবে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
এই ঘটনায় গুদাম-মালিক গঙ্গাধর দাস-সহ মোট তিন জন গ্রেফতার হয়েছেন। তাঁরা বর্তমানে জেলে। আগুনের গ্রাস থেকে বাঁচতে পেরেছিলেন মাত্র দু’জন। তাঁদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
কিন্তু ডিএনএ রিপোর্ট কবে আসবে, তা এখনও অনিশ্চিত। তত দিন ক্ষতিপূরণের চেক হাতে নিয়েও প্রিয়জনের দেহের অপেক্ষায় দিন কাটবে ২৭টি পরিবারের।
