ঢাকা, ১২ ফেব্রুয়ারি: বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণের প্রেক্ষাপটে দুটি ভোটার গোষ্ঠীকে নির্ধারক শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে—জেনারেশন জেড (Gen-Z) এবং নারী ভোটার। এক শীর্ষস্থানীয় দৈনিক দ্য ঢাকা ট্রিবিউন-এর প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই দুই গোষ্ঠী মিলিয়ে মোট ভোটারের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ গঠন করছে এবং তারা ক্রমশ স্বতন্ত্র ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে, যা প্রচলিত দলীয় সমীকরণ ও নির্বাচনী কৌশলকে বদলে দিতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লক্ষ নিবন্ধিত ভোটার রয়েছেন। এর মধ্যে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী প্রায় ৫ কোটি ভোটার এবং ৬ কোটি ২০ লক্ষেরও বেশি নারী ভোটার রয়েছেন। প্রায় ১ কোটি নাগরিক এবার প্রথমবারের মতো ভোট দিচ্ছেন, যা নতুন ও তরুণ ভোটারদের প্রভাব আরও বাড়াচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৪ কোটি ভোটার ১৮-২৯ বছর বয়সী এবং প্রায় ২ কোটি ৬৭ লক্ষ নারী ভোটার ১৮-৩৭ বছর বয়সের মধ্যে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জনমিতিক কাঠামো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তরুণ ও নারী ভোটাররা মিলেই বহু আসনে ফল নির্ধারণ করতে পারেন, বিশেষ করে যেখানে লড়াই হাড্ডাহাড্ডি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই গোষ্ঠীর ভোটের পছন্দ শুধু সরকার গঠনের সমীকরণই নয়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশও প্রভাবিত করতে পারে।
২০২৪ সালের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়া তরুণরাই এবার তথাকথিত “পোস্ট-মুভমেন্ট নির্বাচন”-এ অংশ নিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি রাস্তার আন্দোলন থেকে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক অংশগ্রহণে রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
অন্যদিকে, ৬ কোটিরও বেশি নারী ভোটারের উপস্থিতি নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। তবে নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রার্থীপদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব অত্যন্ত কম—মোট প্রার্থীর মাত্র প্রায় ৪ শতাংশ নারী। ফলে জনসংখ্যার অর্ধেক হওয়া সত্ত্বেও ব্যালটে নারীদের উপস্থিতি সীমিত।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, একাধিক নারী প্রার্থী সাইবার বুলিং, মানহানি, যৌন হয়রানি ও হুমকির শিকার হচ্ছেন।
এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলিও নারী ভোটারদের টার্গেট করে ইস্তেহারে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিএনপি “ফ্যামিলি কার্ড”, স্নাতকোত্তর স্তর পর্যন্ত নারীদের বিনামূল্যে শিক্ষা, নারী সহায়তা সেল, ডে-কেয়ার সেন্টার, স্তন্যদান সুবিধা ও উদ্যোক্তা সহায়তা প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী অতীতে কিছু “নারীবিদ্বেষী” মন্তব্যের সমালোচনার মুখে পড়ার পর জাতীয় নারী সুরক্ষা টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে এবং দেশ-বিদেশে নারীদের নিরাপত্তা ও সম্মানজনক জীবিকার আশ্বাস দিয়েছে।
ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) নিম্নকক্ষে সংরক্ষিত ১০০টি আসনে সরাসরি নির্বাচনের প্রস্তাব করেছে।
তবে এই প্রতিশ্রুতিগুলির বাস্তবতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ‘উই ক্যান’ নামের এক সংগঠনের সমন্বয়ক জনিতা আরা হক। তাঁর বক্তব্য, “নারী ভোটাররা বরাবরই নির্ধারক। কিন্তু ইস্তেহারগুলিতে নারীদের প্রকৃত চাহিদা ও বাস্তবায়ন কৌশল নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা নেই।”
সামাজিক মাধ্যমে “ব্যালটের মাধ্যমে নারীবিদ্বেষের জবাব দিন” ধরনের প্রচারাভিযানও দেখা যাচ্ছে। জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের বিতর্কিত মন্তব্যের পর ১১টি নারী সংগঠন তাঁর প্রার্থীপদ বাতিলের দাবি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি জমা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ছাড়া, তত্ত্বাবধায়ক সরকারবিহীন এবং অন্তর্বর্তী প্রশাসনের অধীনে এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
যদি তরুণ ভোটাররা ২০২৪ সালের সংস্কারমুখী উদ্দীপনা বজায় রাখেন এবং নারী ভোটাররা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেন, তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
