জগদলপুর, ৭ ফেব্রুয়ারি: রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু শনিবার ছত্তিশগড়ের জগদলপুরে তিনদিনের আদিবাসী সাংস্কৃতিক উৎসব ‘বাস্তার পান্ডুম ২০২৬’-এর উদ্বোধন করেন। ঐতিহাসিক লালবাগ মাঠে আয়োজিত এই উৎসবের মাধ্যমে বাস্তারের সমৃদ্ধ আদিবাসী সংস্কৃতি, শিল্পকলা ও জীবনধারাকে উদযাপন করার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের মাওবাদী হিংসার অধ্যায় থেকে শান্তি ও উন্নয়নের পথে যাত্রার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণে বলেন, পান্ডুম বাস্তারের মানুষের জীবনের প্রতিটি স্তরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এক আনন্দের উৎসব। “এই ভূমিতে যখন কৃষক বীজ বপন করেন, সেটাও পান্ডুম। আমের মরসুম এলে সেটাও পান্ডুম। বাস্তারের মানুষ জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উদযাপন করে,” বলেন তিনি। তাঁর মতে, প্রকৃতির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে আনন্দময় জীবনের এই দৃষ্টিভঙ্গি সারা দেশের মানুষের কাছেই অনুপ্রেরণা হতে পারে।
বাস্তারের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের আকর্ষণের কথা স্বীকার করলেও রাষ্ট্রপতি গত চার দশক ধরে চলা মাওবাদী সন্ত্রাসের কারণে এই অঞ্চলের মানুষ যে গভীর কষ্ট ভোগ করেছে, তা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, নিরাপত্তাহীনতা, ভয় এবং অবিশ্বাসের পরিবেশে যুবক, আদিবাসী ও দলিত সমাজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে কেন্দ্র সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপে মাওবাদী হিংসার প্রভাব ক্রমশ কমেছে বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি। তাঁর মতে, বহু মানুষ হিংসার পথ ছেড়ে মূল স্রোতে ফিরে আসছেন। ছত্তিশগড়ে মাওবাদীদের আত্মসমর্পণের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সরকার পুনর্বাসন প্রকল্পের মাধ্যমে তাঁদের সম্মানজনক ও স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।
রাষ্ট্রপতি রাজ্য সরকারের ‘নিয়াদ নেল্লানার যোজনা’-র প্রশংসা করেন এবং বাস্তারের বদলে যাওয়া চিত্র তুলে ধরেন। বিদ্যুৎ, রাস্তা ও পানীয় জল পৌঁছচ্ছে দুর্গম গ্রামে, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা স্কুল আবার খুলছে, শিশুরা ফিরছে শ্রেণিকক্ষে—এই পরিবর্তনকে তিনি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক বলে উল্লেখ করেন।
হিংসা ত্যাগকারীদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি সংবিধান ও গণতন্ত্রের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ জীবনের পথে এগিয়ে যেতে হবে এবং কোনওভাবেই সেই পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া চলবে না।
দরিদ্র, বঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কেন্দ্র সরকারের অগ্রাধিকারের কথাও তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। পিএম-জনমন যোজনা ও ধরতি আবা জনজাতীয় গ্রাম উৎকর্ষ অভিযান-এর মতো প্রকল্পের মাধ্যমে প্রত্যন্ত আদিবাসী এলাকায় উন্নয়নের সুফল পৌঁছচ্ছে বলে জানান তিনি।
শিক্ষাকে উন্নয়নের মূল ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করে রাষ্ট্রপতি বলেন, একলব্য মডেল আবাসিক বিদ্যালয়ের মাধ্যমে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে। তিনি অভিভাবকদের সন্তানদের শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান।
বাস্তার দুর্গাপূজার মতো ঐতিহ্যবাহী উৎসবের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, দেবী দন্তেশ্বরীর প্রতি উৎসর্গীকৃত এই উৎসব আদিবাসী সংস্কৃতি ও ভ্রাতৃত্বের অনন্য প্রতীক। উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহ্য রক্ষার গুরুত্বও তিনি তুলে ধরেন।
বাস্তারের প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিশ্রমী যুবসমাজের প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলি কাজে লাগিয়ে ব্যক্তি ও আঞ্চলিক উন্নয়নে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, এর মাধ্যমেই ‘বিকশিত ভারত’-এর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।
এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ছত্তিশগড়ের রাজ্যপাল রমেন ডেকা, মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণু দেও সাই সহ একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি।
