ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন হওয়াকে একটি বড় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। অধিকাংশ পণ্যে শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর মাধ্যমে এই চুক্তি বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানো, সরবরাহ শৃঙ্খল বৈচিত্র্য আনা এবং দুই বৃহৎ অর্থনৈতিক জোটের কৌশলগত সম্পর্ক গভীর করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে উদযাপনের আড়ালে একটি মৌলিক বিরোধ রয়ে গেছে, যা ভবিষ্যতে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য এই চুক্তির প্রকৃত গুরুত্ব নির্ধারণ করতে পারে। সেই বিরোধের নাম কার্বন।
শুল্ক কমলেও ইউরোপের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (সিবিএএম) বহাল থাকছে। ফলে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, সিমেন্ট ও সার-এর মতো উচ্চ নিঃসরণকারী পণ্যের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশ এখন আর শুধু দাম ও গুণমানের ওপর নির্ভর করবে না, বরং প্রতিটি চালানে থাকা কার্বন ফুটপ্রিন্টের ওপরও নির্ভর করবে। বাস্তবে এর অর্থ হলো, ইউরোপীয় পণ্য ভারতে সহজে প্রবেশের সুযোগ পেলেও ভারতীয় রপ্তানির ওপর নতুন এক খরচের স্তর চাপছে, যা মুক্ত বাণিজ্যের মূল ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ভারতের আপত্তি আদর্শগত নয়, বরং কাঠামোগত। ‘কমন বাট ডিফারেনশিয়েটেড রেসপনসিবিলিটি’ নীতির অর্থ হলো—দেশগুলো ভিন্ন সময় ও ভিন্ন পরিস্থিতিতে শিল্পায়িত হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর উন্নত দেশের সমান জলবায়ু ব্যয় চাপানো বৈশ্বিক বাণিজ্যে বিদ্যমান বৈষম্যকে স্থায়ী করে দিতে পারে। এর সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসতে পারে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে, যেখানে বড় সংস্থার মতো ব্যয়বহুল নিরীক্ষা ও কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা নেই।
এই পরিস্থিতিতে কার্বন কমপ্লায়েন্স আর পরিবেশগত পছন্দ নয়, বরং বাজারে প্রবেশের শর্তে পরিণত হচ্ছে। জলবায়ু নীতি সরাসরি বাণিজ্য কাঠামোর অংশ হয়ে উঠছে। ভারতের সামনে তাই কৌশলগত এক সন্ধিক্ষণ। শুধু বিরোধিতা করলে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের মোকাবিলা করা যাবে না। দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও নিঃসরণ সংক্রান্ত তথ্য ক্রমশ প্রতিযোগিতার মূল মানদণ্ড হয়ে উঠছে।
বিশ্বাসযোগ্য ঘরোয়া কার্বন বাজার, স্বচ্ছ নজরদারি ব্যবস্থা এবং ধাপে ধাপে কার্বন মূল্য নির্ধারণ ভারতীয় রপ্তানিকারকদের দ্বৈত করের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারে। সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি দুর্বলতাকে শক্তিতে পরিণত করতে পারে। তাই এই চুক্তিকে চূড়ান্ত সাফল্য বা ব্যর্থতা নয়, বরং এক সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত। ভবিষ্যতে বাজারে প্রবেশ শুধু আলোচনার টেবিলে ঠিক হবে না, বরং নির্ধারিত হবে জলবায়ু ও বাণিজ্যের অঙ্গাঙ্গি সম্পর্কের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতার ওপর।
previous post
