অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন রবিবার লোকসভায় ২০২৬–২৭ অর্থবছরের ইউনিয়ন বাজেট পেশ করেন। বাজেটে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভারতের টেকসই অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার ওপর জোর দেওয়া হয়।
দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী বলে উল্লেখ করে তিনি জানান, প্রায় ৭ শতাংশ বৃদ্ধির হারে ভারত বিশ্ব অর্থনীতির তুলনায় ভালো অবস্থানে রয়েছে। তিনি বলেন, “মোদি সরকার দ্বিধার পরিবর্তে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে সংস্কারের মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নত হয়েছে এবং দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে।”
এই বাজেটের মূল লক্ষ্য উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অন্তর্ভুক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা—যাতে আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তব সাফল্যে রূপান্তর করা যায়। অর্থমন্ত্রী বলেন, “এটি একটি যুবশক্তি-নির্ভর বাজেট, যা তিনটি কর্তব্য দ্বারা অনুপ্রাণিত—অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, বৈশ্বিক অস্থিরতার বিরুদ্ধে স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তোলা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করা।”
বাজেটে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং গুরুত্বপূর্ণ আমদানির উপর নির্ভরতা কমানোর জন্য একাধিক সংস্কারের ঘোষণা করা হয়েছে। বায়োফার্মা, সেমিকন্ডাক্টর, বস্ত্র ও অবকাঠামো খাতে উৎপাদন বাড়াতে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বায়োফার্মা শক্তি প্রকল্পে ১০ হাজার কোটি টাকা এবং ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৪০ হাজার কোটি টাকা।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME)-কে সহায়তার জন্য তিনস্তরবিশিষ্ট পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকার এসএমই গ্রোথ ফান্ড এবং TReDS ও GeM-এর মাধ্যমে তরলতা ও নিয়ম মানা সহজ করার উদ্যোগ। অবকাঠামো উন্নয়নে মূলধনী ব্যয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১২.২ লক্ষ কোটি টাকা। পাশাপাশি ২০টি নতুন জলপথ ও উপকূলীয় জাহাজ চলাচল প্রকল্পের মাধ্যমে বাণিজ্য ও সংযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
আর্থিক খাতে ব্যাংকিং সংস্কারের জন্য একটি উচ্চস্তরের কমিটি গঠন এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি এনবিএফসি পুনর্গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কর সংস্কারের ক্ষেত্রে ১ এপ্রিল থেকে নতুন আয়কর আইন কার্যকর করা হবে। শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে বিদেশে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে TCS হার কমানো হয়েছে এবং আয়কর আইনের অধীনে মামলা সংক্রান্ত বিধান যুক্তিসঙ্গত করা হয়েছে। ভারতীয় ডেটা সেন্টার ব্যবহারকারী ক্লাউড পরিষেবার জন্য ২০৪৭ সাল পর্যন্ত করছাড় বাড়ানো হয়েছে এবং আইটি পরিষেবায় সেফ হারবার বিধান সম্প্রসারিত করা হয়েছে।
বিশ্ববাজারের সঙ্গে ভারতের সংযুক্তির ওপর জোর দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, “দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ভারতের আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে উদ্ভাবনের চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।”
২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য রাজস্ব ঘাটতি জিডিপির ৪.৩ শতাংশ ধরা হয়েছে এবং ঋণ-জিডিপি অনুপাত কমে ৫৫.৬ শতাংশে নামবে বলে আশা করা হচ্ছে। রাজ্যগুলিকে কর বণ্টনের হার ৪১ শতাংশই থাকছে এবং অনুদান হিসেবে ১.৪ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
বাজেটে সামাজিক খাত ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসা পর্যটন কেন্দ্র, অ্যালায়েড হেলথ দক্ষতা উন্নয়ন, ক্রীড়া সামগ্রী উৎপাদন এবং নারী উদ্যোক্তা ও দিব্যাঙ্গজনদের সহায়তার জন্য একাধিক প্রকল্পের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।অর্থমন্ত্রী সংস্কারের ধারাবাহিকতা তুলে ধরে বলেন, “১৫ আগস্টের পর থেকে ৩৫০টিরও বেশি সংস্কার কার্যকর হয়েছে। সংস্কার এক্সপ্রেস ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়ানোর পথে এগিয়ে চলেছে।”
এই বাজেটকে ২০৪৭ সালের ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষী ভবিষ্যৎ রূপরেখার ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা হয়েছে।
