ড. কল্যাণ চক্রবর্তী
শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর আদরের নরেন সম্পর্কে বলেছিলেন, “নরেন শিক্ষে দিবে/যখন ঘরে বাহিরে হাঁক দেবে।” নরেন কোথায় ‘শিক্ষে দিবে’? ‘ঘরে’ বলতে ভারতবর্ষে, ‘বাহিরে’ বলতে ভারত-বহির্ভূত দেশে। কীভাবে ‘শিক্ষে দিবে’? ‘হাঁক’ দিয়ে, হুঙ্কার দিয়ে, উদাত্ত আহ্বান করে। উদ্বুদ্ধ করবে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যকে।
স্বামীজীকে দেখা গেছে গভীর-গহন তত্ত্বের শিক্ষা দিতে; মিশনের মাধ্যমে মানুষের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণের শিক্ষা দিতে৷ পাশ্চাত্যের ভোগবাদের তীব্র প্রতিবাদ করে, প্রাচ্যের ‘পেটের চিন্তা’ দূর করতে তাঁর হাঁক। এ পথে যেতে হলে ঐশী অবগাহন জরুরি, “হে গৌরীনাথ, হে জগদম্বে, আমায় মনুষ্যত্ব দাও; মা, আমার দুর্বলতা কাপুরুষতা দূর কর, আমায় মানুষ কর।”
স্বামী বিবেকানন্দ এক বহুদর্শী বিশ্বন্ধর মনীষা, কোথায় তাঁর পরশ নেই! বিজ্ঞান-শিল্প-ইতিহাস-সেবা-ধর্ম সবেতেই তাঁর অমল অপূর্ব প্রকাশ। তাঁর শিক্ষা দর্শনও অভূতপূর্ব; ১৩০ বছর আগে শিক্ষা নিয়ে যা ভেবেছেন, ইদানীং তা ভাবছেন শিক্ষাবিদদের কেউ কেউ। তিনি শিক্ষাকে সত্যের সৌকর্যে সংজ্ঞায়িত করলেন, “Education is the manifestation of perfection already in man.” মানুষের মধ্যে যে পরিপূর্ণতা, মানুষের ভেতরের যে পারফেকশন, তার প্রকাশ, তার বাস্তবায়ন, তার ম্যানিফেস্টেশনই হল শিক্ষা।
শিক্ষার গোড়ার কথা হল, কাউকেই শেখানো যায় না, যেটা শিক্ষাবিদ শ্রী অরবিন্দ ঘোষকেও বলতে শুনেছি, বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষিতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে স্থাপিত জাতীয় শিক্ষা পরিষৎ-এ এসে। জন লক-এর ‘Blank Slate’ থিওরি বলছে, শিশু খালি মাথা নিয়ে জন্মায়, একটা ফাঁকা স্লেট যেন! দিনে দিনে অভিজ্ঞতার মধ্যে শেখে শিশু। স্বামীজী তা বিশ্বাস করতেন না। তারা শক্তি সামর্থ্য নিয়েই জন্মায়, আমরা তার সামর্থ্যের বিকাশ ঘটাই। এক অভুক্ত অথচ অতুল্য দেশের বীর সন্ন্যাসী যখন এ কথা বলেন, তখনও সারা বিশ্ব খানিক মেনে নেয়, মনে নেয় না। ভারতবর্ষের অনেক বুদ্ধিজীবীরাও নয়। অথচ বামপন্থার মগজ নোয়াম চমস্কি যখন শিক্ষা বলতে মানুষের ‘innate ability’-র তত্ত্ব দেন, তখন বিদেশ-নির্ভর ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা হৈ হৈ করে মেতে ওঠেন। বুদ্ধিজীবীরা দু’টো ডিগ্রির গর্বে, ‘কলচর-এর গর্বে পাশ্চাত্যের দিকে তাকিয়ে থাকেন, কখন রব উঠবে! স্বামীজীর সমাজতত্ত্ব নয়, বাইরের সাম্যবাদ যখন পুথি-পোড়ো হয়ে ভারতীয় বিদ্যাবিদের মগজে ঢোকে, তখনই তিনি চিল-চিৎকার দেন, শক্তি-কাগজে Essay লেখেন, দেওয়ালে দেওয়ালে লেখা হয়…. শিক্ষা আনে প্রগতি। ঝাণ্ডায় ঢেকে যায় গড়ের মাঠ।
এখন ‘পরিপূর্ণতা’ বা পারফেকশন বলতে আমরা কী বুঝি? বুঝি আমাদের অন্তর্নিহিত সক্ষমতা, বুঝি আমাদের বুদ্ধিমত্তা, আমাদের আত্মোপলব্ধি, আমাদের শাশ্বত দর্শন। ‘ম্যানিফেস্টেশন’ কী? যা আছে, যে অন্তরের সম্পদ আমাদের ভেতরে জমাট হয়ে আছে, তা সুপ্তিদশা থেকে জাগিয়ে তোলা, টেনে বার করে আমারই সম্মুখে উপস্থাপন করা, খুঁজে খুঁজে আমাকেই আবিষ্কার করা, কুলকুণ্ডলিনী শক্তি জাগ্রত করা। স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাদর্শনের মূল কথা হল, সংবিৎ-গৃহ বা জ্ঞানের বসতবাড়ি হল আমাদের অন্তর, আমাদের ভেতরের প্রকোষ্ঠ। সেই অন্তর-কে প্রকাশ করতে হবে। অন্তরবাসীকে বাইরে বোধন করতে হবে৷ এই বোধনের দায়িত্বটুকু পালন করুক শিক্ষাব্যবস্থা।
যে শিক্ষা ব্যবস্থা এই গুরুদায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে, সেই জাতি, সেই সমাজ, সেই রাষ্ট্র তত মঙ্গলময় হবে, শুভঙ্করী হবে, এগিয়ে যাবে। শিক্ষা একটি অনুশীলন। এই অনুশীলনে ইচ্ছাশক্তির প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণে পরিচালনা করতে হবে। মানুষ গড়ার শিক্ষার কথা বলছেন স্বামীজী। বলছেন, “জনসাধারণকে যদি আত্মনির্ভর হতে শেখানো না যায়, তবে জগতের সমগ্র ঐশ্বর্য ভারতের একটা ক্ষুদ্র গ্রামের পক্ষেও পর্যাপ্ত সাহায্য হবে না।” আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কী এভাবে জ্ঞানার্জন হচ্ছে? যদি না হয়, যদি পিছিয়ে থাকি, তবে বুঝতে হবে, আমরা স্বামীজীকে পূজন করছি, তাঁকে আত্মস্থ করছি না, তাঁকে মনন করছি না। “তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই” থাকছি।
শিক্ষা বলতে আমরা শুধু তথ্য সংগ্রহ বোঝাচ্ছি। তথ্য সংগ্রহ আর জ্ঞানার্জন কী এক? স্বামীজী বলছেন, “তথ্য সংগ্রহ করাই যদি জ্ঞান হয়, তাহলে লাইব্রেরির থেকে জ্ঞানী তো আর কেউ নেই।” অর্থাৎ স্বামীজী জীবনমুখী শিক্ষার অবতারণা করলেন এই মন্তব্যে। বই মুখস্থ নয়, চাকরি জোটানোর শিক্ষা নয়, কেরানি তৈরি নয়। অন্তর্নিহিত পূর্ণত্বের বিকাশ ব্যতিরেকে শিক্ষা সম্পূর্ণ নয়। এই শিক্ষা পেতে হলে শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা থাকতে হবে, আবার নিজের প্রতিও আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে, আমি পারবোই, এই ধারণা বদ্ধমূল হওয়া চাই। ইচ্ছাশক্তি তখনই সঠিকভাবে কাজ করে, যখন মনের একাগ্রতা থাকে। আর দরকার ব্রহ্মচর্য পালন। ব্রহ্মচর্য মানে বিশুদ্ধতা, শুচিতা, পবিত্রতার সাধন; তা চিন্তায় হতে পারে, হতে পারে বাক্যে, কর্মে সর্বত্র। ব্রহ্মচর্য পালনের মাধ্যমে চরিত্রবল আসে, মনের তেজ বিকশিত হয়।
প্রস্তুত সময়ের জন্য ব্রহ্মচর্য পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ টিপস্ হল, অ্যানরয়েড মোবাইলকে নিজের বাধ্য রাখা। ইন্টারনেট জগতের শুভঙ্করী দিকটি নিতে হবে, মোবাইল-ভার্চুয়াল-দুনিয়া থেকে আসক্তি এবং তা থেকে প্রস্তুত অবক্ষয়ের মুক্তিই হচ্ছে আজকের ব্রহ্মচর্য পালন, আভিধানিক অর্থ তো আছেই।
