21 C
Kolkata
March 21, 2026
বাংলাদেশ

জামাত ও আমেরিকার সম্পর্ক ‘ভয়ংকর ও অশনিসংকেত’—বাংলাদেশের বিশিষ্ট চিন্তাবিদের সতর্কবার্তা

ঢাকা, ২৪ জানুয়ারি: বাংলাদেশের অন্যতম খ্যাতনামা কবি, লেখক ও রাজনৈতিক দার্শনিক ফরহাদ মাজহার বাংলাদেশের কট্টর ইসলামি দল জামাত-ই-ইসলামি ও আমেরিকার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেন। এই সম্পর্ককে তিনি স্পষ্ট ভাষায় ‘ভয়ংকর’ ও ‘অশনিসংকেত’ বলে অভিহিত করেছেন। শনিবার ঢাকার সংবাদমাধ্যমে এই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

শুক্রবার বিকেলে ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত ‘গ্যাস, বিদ্যুৎ ও নিরাপদ জলের জাতীয় সংকট—সমাজ কী করবে’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় প্রশ্নোত্তর পর্বে ফরহাদ মাজহার এই মন্তব্য করেন। একটি আমেরিকান সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রসঙ্গে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, আমাদের দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল কোনও না কোনওভাবে আমেরিকার সঙ্গে যুক্ত। কেউ সরাসরি, কেউ পরোক্ষভাবে।’

তিনি আরও বলেন, দুই হাজার চব্বিশ সালের আগস্ট মাসে যে গণআন্দোলন হয়েছিল, আন্তর্জাতিক মহলে সেটিকে ‘আমেরিকার স্বার্থে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’ হিসেবেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘আমি শুরু থেকেই এই কথাটা বলে আসছি, কিন্তু সাংবাদিকদের মধ্যে তেমন গুরুত্ব পায়নি।’

ফরহাদ মাজহার স্পষ্ট ভাষায় বলেন, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অপসারণকে তিনি বড় কোনও বিষয় বলেই মনে করেন না। তাঁর বক্তব্য, ‘আমেরিকা চাইলে তাঁকে সরিয়েই দিত। আসল প্রশ্ন ছিল, আমরা কীভাবে একটি নতুন বাংলাদেশি রাষ্ট্র গড়ব। কারণ আমেরিকা একটি ভূরাজনৈতিক শক্তি, আর পৃথিবীতে বলে কিছু নেই যে আন্তর্জাতিক আইন বলে আলাদা কোনও নৈতিক কাঠামো কার্যকরভাবে কাজ করে।’

নিজের উদ্বেগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের আচরণ দেখলেই বোঝা যায় পৃথিবীর বাস্তবতা কতটা কঠোর। এই বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে আমার চিন্তা খুব সাধারণ—আমি কীভাবে সতেরো কোটি মানুষকে নিয়ে বেঁচে থাকব? আমি চাই সতেরো কোটি মানুষ তিনবেলা অন্ন পাক। আমি কোনও যুদ্ধের মধ্যে টেনে নিয়ে যাওয়া হোক, তা চাই না।’

তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ’ নিয়ে কেন কেউ কথা বলে না। তাঁর মতে, এই নীরবতাই আসল বিপদের ইঙ্গিত।

জামাত-ই-ইসলামির অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গাজায় তথাকথিত স্থিতিশীলতা বাহিনী পাঠানোর বিরোধিতা জামাত করেনি। এর থেকেই স্পষ্ট, তাদের সঙ্গে আমেরিকার নীতিগত সামঞ্জস্য এবং সম্পর্ক রয়েছে। সেই কারণেই আমেরিকা এমন বক্তব্য দিচ্ছে। আমি এটাকে খুবই বিপজ্জনক সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছি।’

আলোচনা সভায় ফরহাদ মাজহার বাংলাদেশের নিরাপদ পানীয় জলের সংকট নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এই সংকট রাষ্ট্রের অব্যবস্থাপনা, নদী দখল এবং বাণিজ্যিক লুটপাটের ফল। তাঁর কথায়, ‘আসল রাজনীতি মানে মানুষের জীবনের মৌলিক শর্তগুলির উপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা—খাদ্য, জল, শক্তি ও জমি। এখন নির্বাচন মানে লুটের ভাগাভাগির রাজনীতি। জনগণের পক্ষে রাজনীতি মানে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা।’

বিশ্লেষকদের মতে, ফরহাদ মাজহারের এই মন্তব্য শুধু জামাত ও আমেরিকার সম্পর্ক নিয়েই নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তা, সার্বভৌমত্ব এবং গণতান্ত্রিক পথচলার প্রশ্নেও গভীর রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। এই বক্তব্য আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।

Related posts

Leave a Comment