নিজস্ব সংবাদদাতা, বরানগর: বৃহস্পতিবার সকালে বরানগরের নোয়াপাড়া ব্রহ্মময়ী কালিবাড়ির উঠোনে যেন সময় থমকে দাঁড়াল। একদিকে ঢাকের তাল, অন্যদিকে প্রদীপের আলোয় ভরে উঠল প্রাচীন ইট-কাঠের মন্দির। অরন্ধন উৎসবের আয়োজন যেন মুছে দিল বাইরের ব্যস্ত পৃথিবীকে।
ব্রহ্মময়ী কালিবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা, হরিদ্বারের দশনামী শ্রীপঞ্চায়েতি আখড়া মহানির্বানি মহামন্ডলেশ্বর স্বামী পরমাত্মানন্দ ভৈরব নিজেই এদিন সম্পন্ন করলেন ভোগ-আরতি। তাঁর মুখে উচ্চারিত শ্লোক ও মন্ত্রধ্বনিতে যেন মিশে গেল ভক্তদের কণ্ঠস্বর। ভিড়ের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ কিংবা তরুণ— সবাই যেন অনুভব করলেন, এই আচার কেবল ধর্মীয় নয়, বরং বাংলার স্মৃতি ও উত্তরাধিকারেরও অংশ।
স্বামী পরমাত্মানন্দ ভৈরব বললেন, “অরন্ধন মানে, যে দিন রন্ধন হয় না। আগের রাতে রান্না হয় যা কিছু, পরদিন তা-ই হয় দেবীর উদ্দেশে নিবেদন।” কথাটা শুনতে সহজ, অথচ এর ভিতর লুকিয়ে আছে আদি বাংলার হাজার বছরের সংসার-সংস্কৃতি।
ভাদ্র সংক্রান্তি বা সরস্বতী পূজোর পরদিন—দু’বারই পালিত হয় এই রীতি। কোথাও একে বলা হয় ইচ্ছারান্না, কোথাও বা আটাশে রান্না। ভাদ্রের গুমোট রাতে উনানের আঁচে ভাজা ইলিশ-চিংড়ির গন্ধে ভরে ওঠে গৃহস্থের আঙিনা। পাশে সেদ্ধ আলু, কুমড়ো, কলা, পটল, ছোলা-নারকেল মেশানো কচুশাক, আবার চালতা-গুড়ের চাটনি বা তালের বড়ার মিষ্টি গন্ধ। পান্তা ভাতও যেন এ উৎসবের অপরিহার্য প্রতীক। সবটাই রান্না হয় অল্প জলে, যাতে দীর্ঘ গ্রীষ্মে নষ্ট না হয়।
গ্রামীণ রান্নাঘরের উনানের গর্তকে ধরা হয় মা মনসার প্রতীক। দেবীর ঘট সাজানো হয় শালুক আর ফণিমনসার ডাল দিয়ে। পুজোর শেষে উপোস ভাঙেন গৃহিণীরা, দেবীর ব্রতকথা পড়া হয় আসরে।
এখন অবশ্য শহরের বহুতল ফ্ল্যাটে এই চর্চা বিরল। কিন্তু গ্রামে, নদীর ধার ঘেঁষা গঞ্জে, কিংবা বরানগরের এই কালিবাড়িতে—আজও অরন্ধন ভরে তোলে আবহাওয়া।
একদিনের জন্য রান্না থেমে যায়, অথচ তার মধ্যেই জেগে ওঠে জীবনের প্রতি গভীর আস্থা। ভক্তদের বিশ্বাস, দেবীর কাছে নিবেদন করা এই আচার সংসারকে রক্ষা করে, মঙ্গল আনে। আর আধুনিক ব্যস্ততায় ছেদ পড়লেও, মাটির ভেতরে এখনও বেঁচে আছে এই প্রাচীন রীতি।
