28 C
Kolkata
April 5, 2025
সাহিত্য

মুর্শিদাবাদ অভিযান (৬)

মৃন্ময় ভট্টাচার্য

নির্বিঘ্নে পৌঁছলাম আমাদের অভীষ্ট লক্ষ‍্য, মুর্শিদাবাদে। ঈশ্বরের কাছে একটাই প্রার্থনা। পলাশীর অভিজ্ঞতা যেন এখানে না তাড়া করে। এখানে একদিন থেকে সব ঐতিহাসিক স্থান খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে স্বচক্ষে দেখে কাল শনিবার মা-বাবার হোটেলে ফিরব। আসার সময় মা বারবার বলেছেন, হাজারদুয়ারির মিউজিয়ামটা যেন ভালভাবে দেখে আসি। এটা ভারতের শ্রেষ্ঠ মিউজিয়ামগুলোর মধ‍্যে অন‍্যতম। তাছাড়া আরও নানা দ্রষ্টব‍্যের লিস্ট করে এনেছি।

মুর্শিদাবাদ ষ্টেশন থেকে দুই কিলোমিটার দূরে হাজারদুয়ারি। তবে আগে একটা হোটেলে উঠে ব‍্যাগপত্তর সব রেখে বেরিয়ে পড়ব ইতিহাস অন্বেষণে।

দুটো ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে আমরা সাত মক্কেল চললাম জীবনের প্রথম অভিযানে। রাস্তা আমাদের শহরের মতোই সরু। তবে বেশ কয়েকটি নুড়ি ইঁটের বহু পুরনো বাড়ির ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়ল। প্রায় এক কিলোমিটার যাবার পর একটা প্রকান্ড জরাজীর্ণ গেট দেখতে পেলাম। টাঙ্গার চালক বললেন, এটা মুর্শিদকুলি খাঁ-র তেরী গেট। আরও কিছুটা এগোতেই সাদা রঙের তিন খোপ ওয়ালা বিশাল গেট পেলাম। যার নাম ত্রিপোলিয়া গেট। এটি নাকি মুর্শিদকুলি খাঁ-র জামাই-এর তৈরী। আর একটু এগোতেই মুন্নী বেগম দ্বারা নির্মিত চক্ মসজিদ। এসব দেখতে দেখতে মনে হচ্ছে যেন টাইম মেশিনে চেপে আমরা তিনশো বছর পিছনে পৌঁছে গেছি।

এসে গেছি হাজারদুয়ারির গেটে। কি প্রশস্ত বিশাল বিল্ডিং এই হাজারদুয়ারি! ১৮২৯ খৃষ্টাব্দে ইংরেজদের দ্বারা এটির নির্মাণ শুরু হয়ে তা শেষ হয় ১৮৩৭ খৃষ্টাব্দে। অনেকে ভুল করে মনে করেন, এটা বুঝি নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রাসাদ। সিরাজের প্রাসাদের নাম ছিল হীরাঝিল প্রাসাদ। তা বহুদিন আগেই ভাগীরথীর গর্ভে তলিয়ে গেছে।

যাইহোক, হাজারদুয়ারির গেটের উল্টোদিকেই তিন-চারটে হোটেল রয়েছে। প্রথম থেকে ঠেকে শিখে, এখন আমাদের মস্তিষ্কের নিউরোনগুলো কিছুটা স্বপ্রতিভ হয়েছে। আমরা দু’জন দু’জন করে তিনটি হোটেলে একই সঙ্গে গিয়ে সুবিধা অসুবিধা ও দরাদরি করে পছন্দ করলাম “যাত্রিক” নামের হোটেলটাকে। কাল শনিবার সকাল আটটায় “চেক আউট”। মানে ঘর খালি করে দিতে হবে।
হোটেল থেকে জানতে পারলাম, এখানে ঘন্টা প্রতি দু’টাকা ভাড়ায় সাইকেল পাওয়া যায়। কোনওরকমে একটু হাত-মুখ ধুয়ে চারটে সাইকেল নিয়ে ডবল বাইকে আমরা বেরিয়ে পড়লাম মুর্শিদাবাদের সবচেয়ে দর্শনীয় হাজারদুয়ারির উদ্দেশ্যে।

কি বিশাল চওড়া সিঁড়ি! বিশাল সবুজ ঘাসে ভরা মাঠ! হাজারদুয়ারির উল্টো প্রান্তে শ্বেতশুভ্র অতিকায় বড় ইমামবাড়া। মাঠের মধ‍্যে একটা সুউচ্চ স্তম্ভ। একটা বিশাল আকৃতির প্রাচীন কামান। খুবই নস্টালজিক লাগছে। হাজারদুয়ারির ভিতরে যে আরও কত রহস‍্য আছে, তা ভেবে মন বড় আবেগপ্রবণ হয়ে যাচ্ছে। সবে সেই ঐতিহাসিক সিঁড়ি দিয়ে কিছুটা উঠেছি। দেখি প্রবেশের দুয়ার রুদ্ধ! নোটিশে লেখা “প্রতি শুক্রবার বন্ধ “।

হায়, আমরা কতদিন ধরে পরিকল্পনা করে, অত দূর থেকে স্বপ্নের জাল বুনতে বুনতে কি এই বন্ধ দুয়ার দেখতে এসেছি! হাজারটা দুয়ারের যেকোনও একটা দুয়ার কি এই কিশোর অভিযাত্রীদের জন‍্য খোলা থাকবে না! কেন আমরা গতকাল পলাশীতে সময় অপব‍্যয় করলাম? অভিযান তো মাঠে মারা গেল! আগামীকাল দুপুরের মধ‍্যেই বাড়ি পৌঁছতে হবে। থেকে যাব তার উপায় নেই। কারও বাড়িতেই টেলিফোন নেই। মা-বাবা চিন্তা করবেন। তাছাড়া প্রত‍্যেকের পকেটের অবস্থাও কহতব‍্য নয় যে, বাড়তি একদিন হোটেল ভাড়া, পেটপূজা চালিয়ে নিতে পারব।

মন ভীষণ খারাপ! রাস্তার ওপারেই ভাগীরথী নদী। যাকে আমরা গঙ্গা বলি। হঠাৎ নতুন করে উজ্জীবিত করার জন‍্য রমা বললো, চল সকলে গঙ্গায় স্নান করি। আমি একটু আধটু সাঁতার শিখেছি বটে। তবে এই বিদেশ বিভুঁইয়ে খরস্রোতা নদীতে নামতে সাহস পেলাম না। ভোলা ও মদন আমাকে সঙ্গ দিল। আমরা সাইকেল পাহারায় রইলাম। রমার নেতৃত্বে চারজন গঙ্গায় নামলো। ইচ্ছা এই আমাদের গঙ্গার এক চতুর্থাংশ খালের মতো সরু নদী পারাপার করে, চুঁচুড়ায় গিয়ে গঙ্গা পারাপারের কৃতিত্ব ফাটিয়ে প্রচার করবে।

লোকাল কেউই স্নান করতে নদীতে নামছে না দেখে, একটু খটকা লাগল। যখন ওরা সাঁতরে মাঝ নদীতে, তখন একজন আমাদের কাছে এসে বলল, জলে যারা নেমেছে তারা কি তোমাদের সঙ্গীসাথি? এখানে জলে নামা নিষিদ্ধ, নোটিশ দেখনি? জলে ফরাক্কা থেকে দুটো কুমির এসেছে। ক’দিন আগেই একজনের পা কেটে নিয়েছে। শিগগিরি ওদের উঠতে বলো।

কুমিরের কথা শুনে আমার হাত পা কাঁপতে লাগল। চেঁচিয়ে ওদের ডাকছি বটে। কিন্তু গলা দিয়ে কোনও স্বর বেরোচ্ছে না। নদী পারাপার করতে গিয়ে যদি একজনও পরপারে চলে যায়, তাহলে কি হবে! কাল বাড়ি ফিরবই বা কি করে!

ভোলা হাত নেড়ে ডাকছে আর উচ্চস্বরে চেঁচাচ্ছে। “ওরে তোরা তাড়াতাড়ি ফিরে আয়। জলে কুমির আছে “। শুনতে পাচ্ছে না কেউ। ওপারে যাচ্ছে বলে পিছনের দিকে ওদের লক্ষ‍্যই নেই। আমি কাঁপতে কাঁপতে দেখছি। ওরা আপন মনে সাঁতরে পরপারের দিকে চলে যাচ্ছে। ঈশ্বর, কি যে হবে! শেষে কিনা হিলারি, তেনজিং-এর এভারেষ্ট অভিযানের মতো এখানেও অভিযাত্রীরা মরণ বাঁচন সমস‍্যার সম্মুখীন!

তারপর………. (৭)

Related posts

Leave a Comment