মৃন্ময় ভট্টাচার্য
প্রায় দেড় ঘন্টা হয়ে গেল, সতীশ এখনো এলো না, এই দায়িত্বজ্ঞানহীন ছেলেটার ওপর সবাই তিতিবিরক্ত, আমরা সকলেই মোটামুটি ভদ্র ঘরের সন্তান হওয়াতে এই বয়সে গালাগাল বা চলতি ভাষায় যাকে বলে “খিস্তি” কারো ঠিকমতো শেখা হয়ে ওঠেনি, সে প্রশিক্ষণ থাকলে মনের আগ্নেয়গিরি থেকে লাভা উদগীরণে মনটা একটু জুড়ানো যেত। তবে যে ব্যক্তি গাইড থেকে এখন মিসগাইডে পরিবর্তিত হয়েছে, সেই রবিদা, সতীশের বাপ-বাপান্ত করতে ছাড়ছে না একটুকুও।
সতীশ যাওয়ার সময় আমি জানলা দিয়ে দেখে নিয়েছিলাম ও কোন বাড়িতে ঢুকছে। সবাই বলছে আমরা কি সারারাত পেটে বালিশ চাপা দিয়ে শোবো। প্রদীপ বলে উঠলো ঘরে একটাও বালিশ নেই, চাপা দিবিটা কি!
অসহ্য অবস্থা, এবার একটা কিছু না করলেই নয়।
অগত্যা আমিই চললাম সতীশকে স্বস্থানে ফিরিয়ে আনতে, আমাদের বিপর্যয়ের সাথী করতে। ওই বাড়িটার সদর দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়েছি, কলিং বেল দেখতে পেলাম না, ডাকবো কি নামে? বাড়ির কাউকে তো চিনি না! সতীশের নাম ধরেই চিৎকার করতে লাগলাম। এক মধ্যবয়সী মহিলা দরজা খুললেন, কাকে চাই? আমি বললাম সতীশ কে, সতীশ বলে তো কেউ এ বাড়িতে থাকে না, বলে উনি দরজা বন্ধ করতে উদ্দত হতেই আমি বললাম চুঁচুড়া থেকে যে এসেছে। ও হো মিন্টু, তাই বলো, তা তুমি কে, জানলে কি করে ও এবাড়িতে এসেছে? আমি বললাম আমরাও ওর সঙ্গে বেড়াতে এসেছি।
ভদ্রমহিলা আমাকে ঘরে নিয়ে গেলেন, দেখি সতীশ ডাইনিং টেবিলে বসে গরম ফুলকো লুচি, বেগুনভাজা, পাঁঠার মাংস, আর একবাটি পায়েস নিয়ে গোগ্রাসে গিলছে আর টিভিতে সিনেমা দেখছে। আমাকে দেখে রাগত মুখে চোখ বড় বড় করে বললো "তুই এখানে কি করতে এলি?"
সতীশকান্ড দেখে আমারও মনে তখন লাভা বিস্ফোরণের প্রচন্ড চাপ। তখনই ভদ্রমহিলা বললেন "আজ আমার মেয়ের জন্মদিন, তাই মিন্টূ এসেছে। তুমিও টেবিলে বসে পড়, একটু খেয়ে নাও।" আমার লোভ যে হচ্ছেনা তা নয়, তবু আমি আমার স্বাদগ্রন্থিকে দৃঢ়ভাবে সংযত করে বললাম, আমরা সাতজন অভুক্ত আছি, তাই ওদের ফেলে আমি খেতে পারি না।
সতীশের চোখেমুখে এবার স্পষ্ট ক্রোধের চিহ্ন, একটু উচ্চস্বরেই বললো, "তুই ওখানে যা, আমি এখুনি গিয়ে ব্যবস্থা করছি।"
বন্ধুরা উদগ্রীব হয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল, আমি ফিরতেই জানতে চাইলো ব্যাপারটা কি? আমি স্বচক্ষে যা দেখেছি, হুবহু তা বর্ণনা করলাম। এবার দেখলাম, যারা খিস্তি দিতে জানে না, তারাও একটু আধটু দিতে চেষ্টা করছে, নিজেদের ভদ্রতার পোশাকে ওরা আর নিজেদের আটকে রাখতে পারছে না।
মিনিট দশেকের মধ্যেই আমাদের এই সেলুলার জেলের জেলর শ্রীযুক্ত বাবু সতীশ চন্দ্রের একেবারে গোমড়া মুখে আগমন, আসন্ন ঝড়ের আগে যেমন এক থমথমে পরিবেশ তৈরী হয়, আমরাও সকলে সেরকম একেবারে চুপচাপ। তিনি বাড়ির এক কোণে থাকা ভাঁড়ার ঘর খুলে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া দুটো হ্যারিকেন, একটা পাম্প দেওয়া ষ্টোভ, বড় হাঁড়ি, ডেকচি, হাতা, খুন্তি, তিনটে থালা, কিছুটা কেরোসিন ও চাল বের করে আনলেন।
সারারাত অভুক্ত থাকতে হবেনা বুঝে, আমরা বিদ্রোহ করার বদলে ডিনারের মেনু তৈরীতে ব্যস্ত হলাম, ঠিক হলো মুরগির মাংস আর ভাত খাওয়া হবে। সবাই কুড়ি টাকা করে দিলাম, সতীশ রাতে কিছুই খাবে না বলায় আমরা মুচকি হাসলাম।
নির্বিবাদী জয়ন্তকে ও একটা ঝুল কালি মাখা ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে সতীশ রাত্রি আটটায় বাজারে ছুটলো। আমাদের আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ এ যাত্রায় বিস্ফোরিত না হয়ে অক্ষতই রয়ে গেল।
রাত প্রায় পৌনে নটা নাগাদ, দুটো মশা নিধনের কয়েল, রান্নার মশলাপাতি, সরষের তেল ও সঙ্গে একটা জ্যান্ত মুরগি নিয়ে দুই মক্কেলের পুনরাগমন ঘটলো।
রমা মুরগির মাংস রাঁধতে এক্সপার্ট, কিন্তু এই অন্ধকার রাতে জ্যান্ত মুরগিটার ছাল ছাড়াবে কে?
আমাদের রবিদা নাকি মুরগিও ছাড়াতে পারে। সতীশ কোথাথেকে একটা জং ধরা ছুরি নিয়ে এলো।
নিচে বারান্দায় হ্যারিকেন নিয়ে মুরগি কাটা দেখতে সবাই ভীড় করলাম। রবিদা মুরগির গলাটা শক্ত করে ধরে যেই না একটা কোপ বসিয়েছে অমনি মুরগি রবিদার হাতে গলাটা গচ্ছিত রেখে তার দুটি ডানা ঝাপটে দেহটাকে নিয়ে উড়ে গেল উঠোনের গহন জঙ্গলভরা অন্ধকারে, আমরা হায়, হায় করে উঠলাম।
==========================
কি হলো তারপর?