সংবাদ কলকাতা: আইন, আদালত, রাজ্যের মানুষের নিরাপত্তা কোনও কিছুর কথা না ভেবে নির্লজ্জভাবে শুধু শাসকদলকে সুবিধা করে দিতে একের পর পদক্ষেপ করেছেন রাজ্য নির্বাচন কমিশনার রাজীব সিনহা। যার ফলে রাজ্যে মনোনয়নে নেমেছে একের পর এক হিংসা। মৃত্যু হয়েছে ৮জন মানুষের। নিজের এক্তিয়ার ও ক্ষমতার কথা জেনেও কিসের লোভে, কার নির্দেশে শাসকদলকে সুবিধা করে দিতে এই কাজ করেছেন রাজীব সিনহা? এই প্রশ্ন এখন উঠছে রাজ্যের গ্রামে ও শহরে। আনাচে কানাচে। আদালত তাঁকে সাংবিধানিক নিয়ম পালন ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার জন্য বারবার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু, তিনি দুহাতে সেই সুযোগ হেলায় সরিয়ে দিয়েছেন। যার ফলে বার বার সতর্কবার্তা সত্ত্বেও তিনি সজাগ হননি। বিরোধীদের দাবিকে মান্যতা দিয়ে প্রথমে তাঁকে ৮ জেলায় কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। কিন্তু, তিনি সেই নির্দেশ অমান্য করেছেন বিভিন্ন বাহানায়। ওই ৮ জেলায় কেন্দ্রী বাহিনী নিয়োগ ও স্পর্শ কাতর বুথ চিহ্নিত করার ব্যাপারে কোনও পদক্ষেপ করেনি রাজ্য নির্বাচন কমিশন।
বারবার বিভিন্ন বাহানা দিয়ে গেছে। এর মধ্যে মনোনয়নকে কেন্দ্র করে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে চলে। চোপড়ায় মনোনয়নের মিছিলে সরাসরি গুলি চালায় দুষ্কৃতীরা। তাতেও হেলদোল নেই রাজ্য নির্বাচন কমিশনার রাজীব সিনহার। কিসের কারণে তিনি নীরব? সংবিধান, আইন, আদালতকে বারবার প্রহসনে পরিণত করেছেন তিনি। কোনও পাত্তাই দেননি। আদালত যখন দেখল, পঞ্চায়েত নির্বাচনে মানুষের নিরাপত্তা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে, তখন ১৫ জুন সারা রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়োগের নির্দেশ দিল হাইকোর্ট। কিন্তু, তাতেও ঘুম ভাঙেনি কুম্ভকর্ণ নির্বাচন কমিশনারের। উল্টে সেই নির্দেশ থেকে রেহাই পেতে সুপ্রিম কোর্টে যায় রাজ্য ও নির্বাচন কমিশনার। সারা রাজ্যের তথা দেশের মানুষের কাছে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়, এই সরকার এবং নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে রাজ্যের মানুষের নিরাপত্তা ও সুষ্ঠ গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের ওপর বিন্দুমাত্র কোনও শ্রদ্ধাবোধ নেই। সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে জোড়া থাপ্পড় খেয়েও নির্লজ্জ কমিশনার।
পাল্টা প্রহসন শুরু করে রাজীব সিনহার নেতৃত্বে রাজ্য নির্বাচন কমিশন। তারা জানায় প্রতি জেলায় এক কোম্পানি করে কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়োগ করা হবে। অর্থাৎ একটি জেলায় ৮০ থেকে ১০০ জন আধাসামরিক থাকবে। বিষয়টা এরকম দাঁড়ায়, একটি জেলায় যদি ২০টি ব্লক থাকে, তাহলে ব্লক প্রতি ৪ জনের বেশি আধা সামরিক পাবে না । উদাহরণস্বরূপ রাজ্যের সবচেয়ে জনবহুল উত্তর ২৪ পরগনা জেলার কথা বলা যেতে পারে। এখানে মোট ২২টি ব্লক আছে। ২০০টি গ্রাম পঞ্চায়েত ও ১৫৯৯টি গ্রাম রয়েছে। সেখানে এক কোম্পানি অর্থাৎ ৮০ থেকে ১০০ জনের কেন্দ্রীয় বাহিনী মানে নেহাতই নস্যি তুল্য! ফলে রাজ্য নির্বাচন কমিশন বুধবার চূড়ান্ত থাপ্পড়টি খেল হাইকোর্টের কাছে। বিচারপতি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, জেলা প্রতি এক কোম্পানি নয়, গোটা রাজ্যে ৮২৫ কোম্পানির বেশি কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়োগ করতে হবে। যেটা ২০১৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে করা হয়েছিল। তখন রাজ্য নির্বাচন কমিশনার ছিলেন মীরা পান্ডে। সেবার এই পঞ্চায়েত নির্বাচন নিয়ে মীরা পান্ডের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর সংঘাত আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
এদিন বিচারপতি আরও বলেন, দায়িত্ব পালন করতে না পারলে রাজ্য নির্বাচন কমিশনার পদ থেকে সরে দাঁড়ান। আদালত অবমাননার মামলায় বুধবার এই নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি টি এস শিবজ্ঞানম এবং বিচারপতি উদয় কুমারের ডিভিশন বেঞ্চ। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাহিনী চেয়ে কেন্দ্রকে জানাতে হবে। এদিন শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনারা নিরপেক্ষ সংস্থা। নির্বাচনে কত বাহিনী প্রয়োজন, আপনারা সিদ্ধান্ত নেবেন। কেন আদালতকে বলে দিতে হবে? মানুষ যদি বিশ্বাস হারায়, তাহলে নির্বাচন করে লাভ কী? আপনারা যে পরিমাণ বাহিনীর কথা বলেছেন, তা একেবারেই অপর্যাপ্ত। আপনার কমিশনার যদি দায়িত্ব না নিতে পারেন, তাহলে তাঁর পদত্যাগ করা উচিত। রাজ্যপাল অন্য কাউকে দায়িত্ব দেবেন। বলতে বাধ্য হচ্ছি, কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ থাকছে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক।’
বিজেপির আইনজীবী সৌম্য মজুমদার ও শ্রীজীব চক্রবর্তী সওয়ালে বলেন, ‘২০১৩ সালের পঞ্চায়েত ভোটে ৮২ হাজার কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল রাজ্যে। এবার বাইরের রাজ্যের পুলিস আনার কথা বলা হচ্ছে। তাও ভোটের আগের দিন। যা আদালতের নির্দেশের চূড়ান্ত অবমাননা।’