পল্লব মণ্ডল: আমরা দুটি ভাই শিবের গাজন গাই, ঠাকুমা গেছে গয়া কাশি ডুগডুগি বাজাই’, ছোটবেলার এই ছড়া চৈত্র মাসের গাজনের মধ্যে দিয়ে মনে করিয়ে দেয় , বাঙালীর জীবনে বারো মাসে তেরো পার্বন । শেষে আসে চৈত্র । চৈত্রে গ্রাম্য কন্ঠ সুর তোলে – “ বাবা তারকনাথের চরণে সেবা লাগে ———— ” শিব দেবাদিদেব , আদি যোগী । সভ্যতা, সংস্কার ,আচার ,ব্যবহার, সুর ,ছন্দে সৃষ্টি দেবাদিদেব মহাদেব থেকে । এক দিকে তিনি মহাপ্রলয়ের দেবতা, অপর দিকে তিনি কল্যাণসুন্দর। শিব প্রাগার্য সংস্কৃতির দেবতা। শিবপত্নী উমা-পার্বতী। যুগ যুগ ধরে ভারতীয় দাম্পত্যের শ্রেষ্ঠ আদর্শ। শিবের সাধনা বা পূজার ইতিহাস অতি প্রাচীন । হরপ্পা মহেঞ্জোদারো সিন্ধু সরস্বতী সভ্যতার সময়ও এক দেবতার নিদর্শন পাওয়া যায় যিনি পদ্ম আসনে বিরাজিত এবং তাঁর চারপাশে রয়েছে বিভিন্ন পশু পাখি । তিনটি মাথা এবং তিনটি শিং রয়েছে সে দেবমূর্তির । অর্থাৎ তিনিই পশুপতিনাথ মহাদেব বলে মনে করা হয় । আবার শিব লিঙ্গেরও দেখা পাওয়া গেছে সেই সভ্যতায় । এরকম মুদ্রা প্রচলিত ছিল সেই আদিম সভ্যতায় যেখানে শিবের বাহন বৃষের মূর্তির দেখা পাওয়া গেছে । প্রকৃত অর্থে বৃষ ঐ সভ্যতার প্রতীক বা টোটেম ছিল বলে জানা যায় । ইতিহাস বলে হরপ্পা , মহেঞ্জোদরোর সিন্ধু সরস্বতী সভ্যতাসমকালীন আরো অন্য সভ্যতাগুলিতেও কোন কোন ক্ষেত্রে বৃষকে যে টোটেম হিসেবে পূজা করা হত তারও প্রমাণ রয়েছে । বেদান্তে এই আদি দেবতা পরমেশ্বরের উদ্দেশে বলা হয়েছে –
“ তমীশ্বরাণাং পরমং মহেশ্বরং তং দেবতানাং পরমঞ্চ দৈবতম ”
শুক্ল যজুর্বেদে ও “মহারুদ্র ” র উল্লেখ পাওয়া যায় । অর্থাৎ শিবের উপাসনার ইতিহাস অতীব প্রাচীন বলেই মনে করা হয় । গুপ্ত-পাল-সেন পর্বে উমা-মহেশ্বরের যুগ্মমূর্তি জনপ্রিয় ছিল।
গাজন’ শব্দের উত্পত্তি সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে গর্জন শব্দ থেকেই গাজন শব্দের উত্পত্তি লাভ ঘটেছে। বলা হয়, মহাদেব বা শিবের নামে সন্ন্যাসীদের উচ্চস্বরে জয়ধ্বনি গর্জনের মতো শোনায়, তাই এই অর্থই ক্রমে গাজন উত্সবের রূপ নিয়েছে। অন্য একটি মতে ‘গাঁ’ বা ‘গাঁ-গঞ্জ অর্থে গ্রাম, ‘জন’ অর্থে জনগণ, অর্থাত্ গ্রামের জনসাধারণের মধ্যে প্রচলিত উত্সব হল গাজন। রাঢ় বাংলার অন্যতম প্রধান উত্সব গাজন, আর সেই গাজনকে কেন্দ্র করে এমন উত্সাহ উদ্দীপনা সারা রাঢ়দেশে দেখা যায়।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, চৈত্রে শিবগাজন উৎসব হর-কালীর বিয়ের অনুষ্ঠান। যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি লিখেছিলেন, ‘‘শিবের গাজনের প্রকৃত ব্যাপার হর-কালীর বিবাহ। শিবের গাজনে দু’জন প্রধান সন্ন্যাসী শিব ও পার্বতী সেজে আর অন্যান্যরা নন্দী, ভৃঙ্গী, ভূতপ্রেত, দৈত্যদানব প্রভৃতির সং সেজে এই শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করে। এই শোভাযাত্রায় শিবের নানা লৌকিক ছড়া আবৃত্তি ও গান করা হয় , তার তালে চলে নাচ । চৈত্রসংক্রান্তির গাজনে কালী নাচ একটি উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান। ধর্মের গাজনের বিশেষ অঙ্গ হল নরমুণ্ড বা গলিত শব নিয়ে নৃত্য বা মড়াখেলা বা কালিকা পাতারি নাচ। জ্যৈষ্ঠমাসে মনসার গাজনে মহিলা সন্ন্যাসী বা ভক্ত্যারা অংশ নেয়, তারা চড়কের সন্ন্যাসীদের মতোই অনুষ্ঠান পালন করে।
আগে বলেছি গাজন তিন প্রকার নানা পৌ্রাণিক ও লৌকিক দেবতার নামের , শিবের গাজন, নীলের গাজন,ধর্মের গাজন, আদ্যের গাজন,বীর বলাই’ গাজন।‘বীর বলাই’ গাজন( বীর বলাই বিষ্ণুর অবতার)।
গাজন বিষয়ে ভারতকোষকার জানিয়েছেন, ‘‘বাংলাদেশের লৌকিক উৎসব। ইহা নিম্নশ্রেণির লোকের মধ্যে বাগদি , ডোম- বাউড়ি দের ব্যাপকভাবে প্রচলিত। … বাংলাদেশে ইহা নানা পৌরাণিক ও লৌকিক দেবতার নামের সহিত যুক্ত হইয়াছে, যেমন শিবের গাজন, ধর্মের গাজন, নীলের গাজন, আদ্যের গাজন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই উৎসবের লক্ষ্য সূর্য এবং তাহার পত্নী বলিয়া কল্পিত পৃথিবী। সূর্যের সঙ্গে পৃথিবীর বিবাহ দেওয়াই এই অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য। চৈত্র মাস হইতে বর্ষার প্রারম্ভ পর্যন্ত সূর্য যখন প্রচণ্ড অগ্নিময় রূপ ধারণ করে তখন সূর্যের তেজ প্রশমন ও সুবৃষ্টির আশায় কৃষিজীবী সমাজ এই অনুষ্ঠানের উদ্ভাবন করিয়াছিল। গ্রাম্য শিবমন্দিরকে কেন্দ্র করিয়া এই উৎসবের অনুষ্ঠান হয়।’’ গাজনের কদিন সেই শিব সমাজের নিম্ন কোটির মানুষের হাতে পূজা গ্রহণ করেন। এখানে কোনও ভেদাভেদ নেই, জাত নেই, কুল নেই, উচ্চবর্ণের অবজ্ঞা অবহেলা নেই। এ কদিন সবাই সমান মর্যাদায় সমাসীন। এখানেই শৈব সংস্কৃতির সঠিক উত্তরণ। গাজনের সময় শিব প্রকৃত অর্থে ‘গণদেবতা । ‘ধর্মরাজের বাৎসরিক পূজা বা গাজন-উৎসব’ সাধারণতঃ ‘বৈশাখী বুদ্ধ পূর্ণিমা’, ‘জৈষ্ঠ পূর্ণিমা’, ‘পৌষ সংক্রান্তি’ বা কোন নির্ধারিত দিনে (যা ‘আপন-গাজন’ নামে পরিচিত) অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। ধর্মরাজের গাজনেও শিবের গাজনের মতো ‘বাণফোঁড়া’, ‘কাঁটাঝাঁপ’, ‘ধুনা পোড়ানো’, ‘বটিঁ ঝাঁপ’ ইত্যাদি হয়ে থাকে। বর্ধমান জেলায় শতাধিক ধর্মঠাকুরের পূজা-উৎসব, অনুষ্ঠান বিভিন্ন রীতি বা পদ্ধতিতে, বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন সম্প্রদায় কতৃক অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
গবেষকরা বলছেন , বাংলার গ্রামীণ উৎসবগুলির মধ্যে কিছু আছে যা ফসল উৎপন্ন হওয়ার আগে অনুষ্ঠিত হয় আর কিছু আছে যেগুলি ফসল উৎপন্ন হওয়ার পরবর্তী সময়ে পালিত হয় । অর্থাৎ কৃষি প্রধান দেশের পালা পাব্বন সবই কেন্দ্রীভূত ছিল ফসল কে ঘিরে । গাজন অনুষ্ঠিত হয় ফসল উৎপাদন হওয়ার পূর্ববর্তী সময়ে চৈত্র অবসানের কালে । তখন মানুষের সামনে আসছে রুক্ষ রুদ্র বৈশাখ । ধরণী শুষ্ক হয়ে উঠবে । ফসল ফলাবার আশাই যেন হারিয়ে যাবে গ্রাম বাংলার মাঠ থেকে । পুকুর ,নদীর ঘাট থাকবে নির্জলা । তাই ফসলের কামনায় , জলের জন্য প্রার্থনায় মানুষ জন মিলিত হয়ে আকুল ভাবে ডাক পাড়ে – “ বাবা তারকনাথের চরণে সেবা লাগে ।” নীলকন্ঠ মহাদেব যেমন সমুদ্রমন্থন কালে সকলকে জীবন দান করেছিলেন সব হলাহল টুকু নিজ কন্ঠে ধারণ করে । তাঁরই কৃপায় অমৃতের অধিকারী হয়েছে দেবতাকুল । তেমন ভাবেই নিজ সংসার , সন্তানের মঙ্গল কামনায় একটি দুটি গ্রাম নয় এক একটি বড় অঞ্চল মিলিতভাবে প্রার্থনা করে সু ফসলের , সু স্বাস্থ্যের ,নির্মল আনন্দের । ব্রজ মিত্র লিখছেন “ বঙ্গে দারুণ গ্রীষ্মের দহনে যখন সমস্ত জল শুকিয়ে তৃণহীন প্রান্তর ধু ধু করে , তখনই বঙ্গে গ্রামে গ্রামে গাজন উৎসব পালিত হয় ’” । সেজন্যই গাজনের সঙ্গে জলের রয়েছে এক অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক । কোথাও কোথাও নদী বা পুকুর থেকে ভারা ভারা জল নিয়ে এসে শিবমন্দিরে ঢালা হয় । মন্দিরের থেকে জল বেরিয়ে যেতে পারে এমন ছিদ্রগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয় । জলে মন্দির থই থই করে । ভক্ত প্রার্থনা করে সামনে যে রুক্ষ খরার দিন আসছে তখন তুমিও আমাদের পরিবারকে , গ্রামকে এরকমই তোমার করুণা ধারায় সিক্ত করে রেখো , হে মহাদেব । হে শঙ্কর , সু ফসল দিও ঘরে ঘরে । তাই মূলতঃ বাংলার ‘রাঢ় অঞ্চলের’ ‘দুর্গাপুর’, ‘আসানসোল’, ‘অজয় ও দামোদর নদীর তীরের বীরভূম অঞ্চল’, ‘মানভূম’, ‘বর্ধমান’, ‘উভয় ২৪ পরগণা’, মুর্শিদাবাদে’ও পালিত হয় এই লোকউৎসব। পশ্চিমবঙ্গ বিভিন্ন ধর্মের মিলনস্থল হওয়ায় এখানকার বিভিন্ন উৎসবেও তার প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখা যায়, গাজনও তার ব্যাতিক্রম নয়। আর সেই জন্যই ‘বৌদ্ধ’, ‘জৈন’, ‘হিন্দু ধর্মের’ বিভিন্ন রীতির প্রতিফলন দেখা যায় এই উৎসবে ।
চৈত্র সংক্রান্তিতে গাজন অনুষ্ঠিত হলেও তার প্রস্তুতি তৈরি হয়ে যায় মাসের প্রথম থেকেই । যারা গাজনের পুজোয় অংশ নেন তাদের অনেকেই মাসকাল ব্যাপী নিজেদের প্রস্তুত করেন শিবের ভক্ত হিসেবে । তাই তাদের আর এক নাম দেওয়া হয় ভক্তা । নিরামিষভোজী থেকে , একবেলা আহার গ্রহণ করে , ভিক্ষাণ্ন জীবী হয়ে পুরো মাস অতিবাহিত করে নিজেদের প্রস্তুতি নেন ভক্তকুল । দিকে দিকে গর্জন ওঠে – “ বাবা তারকনাথের চরণে সেবা লাগে গো ” । এখন অবশ্য কেউ কেউ চৈত্র সংক্রান্তির সাত দিন আগে , কেউ বা তিন দিন আগে থেকে কঠোর নিয়ম পালন করেন । ভক্তা হওয়ার জন্য কোন বৈশিষ্ট্যের প্রয়োজন নেই । সমাজের নারী , পুরুষ , জাতি , ধর্ম নির্বিশেষে সন্ন্যাস পালন করতে পারেন । বিনয় ঘোষ লিখছেন – “ ভক্ত্য দের মধ্যে ডোম , চণ্ডল , বাউড়ি অর্থাৎ অব্রাম্ভন , অনুন্নত শ্রেণীর আধিক্যই দেখা যায় । ” তাঁরা গেরুয়া বস্ত্র পরিধান করেন । নিরামিষ আহার গ্রহণ করেন । সারাদিন গ্রামে গ্রামে ভিক্ষা করে চাল , ডাল , আলু প্রভৃতি সংগ্রহ করে সন্ধ্যায় একবার পাক করে সেই খাদ্য গ্রহণ করেন।
গাজন উৎসবের মূল তিনটি অংশের নাম –
১. ঘাট সন্ন্যাস ,
২. নীলব্রত
৩. চড়ক ।
২৫ শে চৈত্র থেকে গাজনের মূল উৎসবের শুভ আরম্ভ
২৫শে কামান
কামান মানে হল চুল, দাড়ি, গোঁফ, নখ পরিষ্কার করে কায়মনোবাক্যে শিবধর্মের প্রতি সমর্পিত হওয়া। বেশিরভাগ মানুষ সন্ন্যাসী হওয়ার জন্য হয় ২৫ চৈত্র তারিখে কামায়, না হলে তারা ২৭শে বা ফুল-ভাঙার দিন কামায় বা সন্ন্যাস ব্রত হিসাবে গ্রহণ করে ।
২৬শে গ্রাম প্রদক্ষিণের দিন
মাসিক ভক্ত বা সন্ন্যাসীরা ছাড়াও চৈত্র মাসের ২৫ তারিখে সংখ্যাধিক মানুষ সন্ন্যাসী হিসাবে ব্রত পালন করা শুরু করে, তাদের গ্রাম প্রদক্ষিণ শুরু হয় ২৬ তারিখে।স্নান করে উপবাস ব্রত ভঙ্গ করে এবং বাড়িতে/মন্দিরে ফিরে সিদ্ধভাত গ্রহণ করে, যদিও সারাদিন তারা ফলমূলাদি খায় । এখানে আরও একটি তথ্য জানা দরকার, গাজনের প্রতিটা দিনগুলির মধ্যে তিন বার গঙ্গা স্নান বাদ দিলে বাকি দিনের বিভিন্ন সময়ে সন্ন্যাসীরা গ্রামের বিভিন্ন পুকুরে স্নান করে তাদের ব্রত ভঙ্গ করে। এইভাবে কেন তারা বিভিন্ন পুকুরে স্নান করে? এই তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখেছি যে পুকুরগুলোতে ভক্ত বা সন্ন্যাসীরা স্নান করে সেখানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মানুষ দেবতামূর্তি বিসর্জন করে, অর্থাত্ তাদের কাছে সেই পুকুরগুলো অবস্থান পবিত্র জলাশয় হিসাবে গণ্য হয়।
ফুল-ভাঙার দিন
ফুল-ভাঙা দিন বা খাজুর-ভাঙা দিন , সাধারণত চৈত্রমাসের ২৭ তারিখে ফুলভাজা বা খাজুর ভাজা হয়। এই দিনে সকাল থেকে সন্ন্যাসীরা উপোষ করে থাকে এবং সকালে গঙ্গায় স্নান করে আসে। দুপুরে ১২টার দিকে পূজার পর প্রধান পুরোহিত সন্ন্যাসীদের গলায় শৈবপৈতে, ডান হাতে বেতের বালা এবং বিকালে ফুল-ভাজার আগে পুরোহিত সন্ন্যাসীদের লতাপাতার উত্তরীয় পরিয়ে দেয়। তারা সেদিন বিকালে গ্রামের বিভিন্ন ফলের গাছের ডাল ভেঙে বেড়ায়। ফুল ভাঙতে যাওয়ার আগে তারা সারা শরীরে চন্দনের ফোঁটা দিয়ে রাঙিয়ে দেয়। হাতে পরে আকন্দ ফুলের বালা ও মাথায় এবং গলায় পরে আকন্দ ফুলের মালা। তারা মুখে জয়ধ্বনি দিয়ে গান করে – ‘ ও সাঁতুলে, ফুল ভাঙতে যাবো মোরা…’। ( পূর্ব বর্ধমান, গঙ্গাটিকুরি গ্রামের গাজনের জয়ধ্বনি)
এই ফলের গাছের ডাল ভাঙাকে মানুষ মনে করে – তাদের গাছ ও জমি আরও শস্যশ্যামলা হবে। ফলের গাছে আরও বেশি ফল উত্পন্ন হবে। হয়তো ফুল ভাঙা নামটি সেই অর্থে প্রজনন বা নবমুকুলের সাথে যুক্ত অর্থাত্ ভগবানের কাছে প্রিয় গাছকে উত্সর্গ করলে আরও বেশি ফলন হবে।
এই ফুল ভাঙার দিন সন্ধ্যা থেকে সারারাতই রাঢ়দেশীয় সমস্ত শিব মন্দিরে ধুমধাম করে বোলান গান অনুষ্ঠিত হয়, এই বোলন গুলির মধ্যে দাঁড় বোলান, পালা বোলান প্রভৃতি বেশি হয় এবং পরের দিন জল-সন্ন্যাসের দিন শ্মশান বোলান বেশি দেখা যায়। এইভাবে রাত গড়িয়ে ভোররাতে শুরু হয় ঢেলাভাঙা নামক বিচিত্র আচার, যা সন্ন্যাসীরা পালন করে এবং তারপরই বিখ্যাত আচার ‘গাজন- সিদ্ধি ‘, এই আচারে একশ আট শিবকে ভারতীয় যোগ-সাধনার সাথে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এই সিদ্ধি আচারে দৈহিকভাবে ক্ষমতাশালী সন্ন্যাসী ছাড়া বাকিরা অংশগ্রহণ করে না।
জল-সন্ন্যাস দিন
ফুলভাঙার রাত ঘুমে-জাগরণে পার হওয়ায় পর পরের দিন সারাদিন নির্জলা উপোসী থেকে বিকালের পর শিবলিঙ্গ ও শিবের দোলকে স্নান করাতে গঙ্গায় যায় সমস্ত সন্ন্যাসীরা। গঙ্গায় স্নান করে উপোষ ভঙ্গ করে তারা বাড়ি ফিরে ফল ও গঙ্গা জল পান করে। সারাদিন নির্জলা দাঁড় বোলান ও পালা বোলান হলেও দুপুরের বিশেষ আকর্ষণ হল শ্মশান বোলান বা কালকেপাতাদের বিচিত্র অঙ্গ সজ্জা করে তাদের লোকাচার প্রদর্শন। তারা সারাদিন উপোষ থেকে গোটা শরীরে ভূতপ্রেতাদির আঙ্গিকে অঙ্গ সাজায় এবং মড়ার মাথা নিয়ে বিচিত্র সব ছড়া কাটে, গান গায়।
বলা হয়, এই বিশেষ দিনে গঙ্গা স্নানফেরত প্রতিটি মানুষকে ছোলা, গুড়, কুল, ফল ও জল খাওয়াতে হয়, তাই বিভিন্ন স্থানে বিনামূল্যে খাওয়ানো ব্যবস্থা করা হয় পথযাত্রীদের এবং সন্ন্যাসীদের জন্য গঙ্গা জল পান ও ফলমূলাদির গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়, এই ব্যবস্থাকে রাঢ়দেশীয় জলসত্র বলা হয় ।
হোম পুজোর দিন
চৈত্রমাসের ২৯ তারিখে গাজনের বিশেষ হোমের পুজো, নীলপুজো এবং বলিদান সম্পন্ন হয়। এই দিনেই দুপুরে বাণেশ্বর বা প্রতীক ঈশ্বরকে নিয়ে গ্রাম পরিক্রমা হয়। এই দিন দুপুরে কয়েকজন সন্ন্যাসী বাণেশ্বরকে নিয়ে শিবতলা, নতুন ধর্মরাজতলা, পুরানো ধর্মরাজতলা, ষষ্ঠীতলা, বাজারকালীতলাতে ছাড়াও বহু মানুষের বাড়িতে উপস্থিত হয় এবং সাধারণ মানুষ সন্ন্যাসীদের সিধে হিসাবে চাল, ডাল, আলু, সরষের তেল, নুন, সিঁন্দুর, চিনির ছাঁচ এবং নগদ পয়সা তুলে দেয়। মনে করা হয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় বস্তুগুলি সাধারণ মানুষ দেবতাদের উদ্দেশ্যে উত্সর্গ করার জন্যই সন্ন্যাসীদের হাতে তুলে দেয়। বিকালে সন্ন্যাসীরা নদীতে স্নান সেরে নীলপূজাতে অংশগ্রহণ করে এবং তারপরই পাঁঠা বলি হয় প্রচুর। এইদিনটিতেও সন্ধ্যা থেকে সারারাত বোলন গানের আসর বসে।
চরক সংক্রান্তি
হিন্দু ধর্মে “নাথ” পরম্পরা বৌদ্ধ তান্ত্রিক ক্রিয়া থেকেই পরবর্তী কালে উদ্ভব চড়ক পূজার। পাল সেন যুগের শিলালিপিতে চড়কের উল্লেখ আছে ।
” যোগীপাল ভোগীপাল মহীপাল এর গীত
ইহা শুনিবারে সর্ব্ব লোক আনন্দিত “
চৈত্রের ৩০ তারিখ বা বছরের শেষদিন তথা গাজনের শেষদিন। পূজার আগের দিন চড়ক গাছটিকে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয়। এতে জলভরা একটি পাত্রে শিবের প্রতীক শিবলিঙ্গ বা সিঁদুরমথিত লম্বা কাঠের তক্তা (‘শিবের পাটা’) রাখা হয়, যা পূজারিদের কাছে “বুড়োশিব” নামে পরিচিত। পতিত ব্রাহ্মণ এ পূজার পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করেন। পূজার বিশেষ বিশেষ অঙ্গ হলো কুমিরের পূজা, জ্বলন্ত অঙ্গারের ওপর হাঁটা, কাঁটা আর ছুঁড়ির ওপর লাফানো, বাণফোঁড়া, শিবের বিয়ে, অগ্নিনৃত্য, চড়কগাছে দোলা এবং দানো-বারনো বা হাজরা পূজা করা।
চড়কগাছে ভক্ত্যা বা সন্ন্যাসীকে লোহার হুড়কা দিয়ে চাকার সঙ্গে বেঁধে দ্রুতবেগে ঘোরানো হয়। তার পিঠে, হাতে, পায়ে, জিহ্বায় এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গে বাণ শলাকা বিদ্ধ করা হয়। কখনো কখনো জ্বলন্ত লোহার শলাকা তার গায়ে ফুঁড়ে দেয়া হয়।
চড়ক পূজায় বিশেষ বৈশিষ্ট ভক্তের পিঠে লোহার হূক (বরশি) লাগিয়ে গাছে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। হুক লাগানো অবস্থায় ঘুরতে থাকে ভক্ত। ঘোরা শেষ হলে রক্ত বা কাটা চিহ্ন মিলয়ে যায়। এই বিশেষ দিনে চড়কপূজা অনুষ্ঠিত হলেও এর প্রস্তুতি চলে টানা পনের দিন। শিব পার্বতীর পালা গেয়ে আয়োজকরা পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায়। চাল-ডাল, টাকা-পয়সা, মাগন (ভিক্ষা ) তুলে পূজার খরচ জোগাড় করে। চড়ক পূজাকে ঘিরে এই উৎসব উপভোগে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অগণিত শিশু ও নারী পুরুষের সমাগম ঘটে। বছরের শেষ দিনটিকে পূর্ব ও উত্তর বঙ্গের মা কাকিমারা পালন করতো ছাতুব্রত হিসাবে। উত্তর রাঢ়বঙ্গেও আমরা ছেলেবেলায় সকালে স্নান করে ছাতু গুড় দিয়ে মুড়ি খেতাম। দুপুরে সন্ন্যাসীদের ভেঙে আনার নিমের পাতা নিয়ে বাড়িতে হতো ভাতের সঙ্গে আম-ডাল, লালতে শাক, বেগুন-নিমপাতা ভাজা, ইঁচড়ের তরকারি, তেঁতুল দিয়ে গুড়-অম্বল, বেগুন-পটল-ঢ্যাঁড়শ ভাজা এবং পায়েস। মনে করা হয়, মরসুমি শাকসবজির মাধ্যমে ইমিউনিটি বুস্ট করার জন্য এসব খাবার প্রথা শুরু হয়েছিল। পূর্ববঙ্গে ইঁচড়ের তরকারি সঙ্গে নিমপাতা ভাজা, আম-ডাল, ডাটা, পায়েস থাকলেও শাক হিসাবে তারা গিমির শাককে বেশি প্রাধান্য দিতো। পূর্ববঙ্গের এদিন বোন দিদিরা ভাইদের সামনে ছাতু উড়িয়ে ভাইদের শত্রুদের বিনাশের প্রার্থনা করতো, এ প্রথা আজও টিকে আছে ‘ভাইছাতু’ প্রথা নামে। এছাড়াও বছরের শেষ দিনে ঘরে ঘরে পালিত হতো ‘ধর্ম্মঘট ব্রত’। আজও নদিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামে টিকে আছে সে প্রথা।
উপরোক্ত পৌরাণিক বিশ্লেষণ, এবং মহাদেবের লৌকিক রূপ আলোচনা প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি শিব ঠাকুর বাঙ্গালীদের অত্যন্ত আপন, অত্যন্ত প্রিয় এবং শ্রদ্ধার। বাঙ্গালী জাতি ও বাংলার উপর প্রভু মহেশ্বর এর কৃপা দৃষ্টি সর্বদা বহাল থাকুক ।
।। বন্দে দেবমুমাপতিং সুরগুরুং বন্দে জগত্কারণং
বন্দে পন্নগভূষণং মৃগধরং বন্দে পশূনাম্পতিম্ ।।
বন্দে সূর্যশশাঙ্কবহ্নিনয়নং বন্দে মুকুন্দপ্রিয়ং
বন্দে ভক্তজনাশ্রয়ং চ বরদং বন্দে শিবং শঙ্করম্॥
।। হর হর মহাদেব ।।
next post