21 C
Kolkata
March 23, 2026
উত্তর সম্পাদকীয় দেশ

আরভিএম নিয়ে রাতের ঘুম নষ্ট তৃণমূলের, নেতাদের কপালে বলিরেখা

সুভাষ পাল: আরভিএম! এই সংক্ষিপ্ত শব্দ বন্ধটির পুরো কথা হল ‘রিমোট ভোটিং মেশিন’। আর এই শব্দটিই চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূলের শীর্ষ নেতাদের কপালে। তাঁদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু কেন?

সময় পাল্টাচ্ছে। উন্নত হচ্ছে প্রযুক্তির। মানুষ সেই উন্নত প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে গড়ে তুলছে নিরাপদ ও উন্নত জীবন প্রণালী। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রশক্তিও মানুষের কাজের সুবিধার্থে এই প্রযুক্তিকে সাধ্যমতো অগ্রাধিকার দিয়েছে। কৃষি থেকে শিল্প, যানবাহন থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সবকিছুতেই উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োগ হয়ে চলেছে। আগামীতেও হবে। তাহলে আরভিএম নিয়ে তৃণমূলের শীর্ষ নেতারা কেন এত চিন্তিত? কী তার কার্যকারিতা? জানা গিয়েছে, আরভিএম বা রিমোট ভোটিং মেশিনের মাধ্যমে রাজ্যের বাইরে থাকা ব্যক্তিরা অনলাইনে তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করতে পারবেন। অনেকটা পোস্টাল ব্যালটের উন্নত সংস্করণ। সেখানে সরকারি কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও ভোটদানে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন। এই একটি আরভিএম মেশিনে এক সঙ্গে ৭২ টি লোকসভা কেন্দ্রের পরিযায়ী ভোটারদের ভোট গ্রহণ করা যাবে। এব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি চলছিল দীর্ঘদিন ধরে। এখন সেটি প্রস্তুত। এবার শুধু অনুমোদনের অপেক্ষা। সেই অনুমোদন পেলেই আগামী লোকসভা নির্বাচন থেকেই সেটি কার্যকর করা হবে।

প্রথম পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলির মতামত গ্রহণ করা হচ্ছে। সেজন্য রিমোট ভোটিং মেশিন নিয়ে সম্প্রতি একটি সর্বদলীয় বৈঠক ডেকেছিল কমিশন। কিন্তু সেই বৈঠকে বিজু জনতা দল বাদে বিরোধিতা করেছে দেশের সিংহভাগ রাজনৈতিক দলগুলি। কংগ্রেস, জেডিইউ, আম আদমি পার্টি, ডিএমকে, সমাজবাদী পার্টি, সিপিএম, সিপিআই, সিপিআইএম(এল)-এর মতো বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। তবে এই বিরোধিতার মুখ্য ভূমিকায় ছিল পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। তারাই অন্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির কন্ঠে বিরোধিতার সুর বেঁধে দেয়। তৃণমূল প্রশ্ন তোলে, পরিযায়ী ভোটারের সংজ্ঞা কী? তার কি কোনও নির্দিষ্ট তালিকা আছে? যে রাজ্যে ভোট নেই, সেখানে কীভাবে আদর্শ নির্বাচন বিধি কার্যকর হবে? সেখানে কোনও দলের দাদাগিরির মুখে পড়বে না তার গ্যারান্টি কোথায়? সেইসব রাজ্যে কোনও দলের পক্ষে নির্বাচনী এজেন্ট পাঠানো সম্ভব নয়। এই সব নানান ফিরিস্তি। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, তৃণমূলের সর্ব ভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় গত ১০ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনের সচিব বিসি পাত্রকে একটি চিঠি দিয়েছেন। সেই চিঠিতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, এই পদ্ধতিতে ভোট স্বচ্ছ ও অবাধ হবে কিনা? রিমোট ভোটিং ব্যবস্থার ফলে ভোট কারসাজি হতে পারে বলে তাঁর আরও অভিযোগ।

অন্যান্য রাজনৈতিক দলের চেয়ে আরভিএম নিয়ে সবচেয়ে বেশি গাত্রদাহ হয়েছে তৃণমূলের। আদৌ এই মেশিনের প্রজনীয়তা আছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তৃণমূলের শীর্ষ নেতারা। নির্বাচন কমিশন আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে রিমোট ভোটিং মেশিন নিয়ে সব রাজনৈতিক দলগুলিকে মতামত জানানোর সময় নির্ধারণ করেছিল। এই মেশিনের ৯টি পয়েন্টের ফিডব্যাক ফরম্যাট পাঠানো হয়েছিল সব রাজনৈতিক দলগুলিকে। কিন্তু তৃণমূলের এই বিরোধিতার জন্য রাজনৈতিক দলগুলির সময়সীমা ১ মাস বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ ৩১ জানুয়ারির পরিবর্তে আগামী ২৮শে ফেব্রুয়ারি মতদানের সময়সীমা নির্ধারণ করেছে নির্বাচন কমিশন।

কেন প্রয়োজন হল এই আরভিএম মেশিনের? কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, ভারতের প্রায় ৩০ কোটি ভোটার কর্মসূত্রে বা অন্যান্য জরুরি কারণে বাইরে থাকার জন্য ভোট দিতে পারেন না। যার ফলে দীর্ঘ কয়েক দশকের সমীক্ষায় দেখা গেছে, অধিকাংশ ভোট কেন্দ্রে ভোটের হার কখনওই ১০০ শতাংশের কাছাকছি পৌঁছয় না। যার ফলে গণতান্ত্রিক মতদান স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় না। এদিন নতুন দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে নির্বাচন কমিশনের ডাকা সর্বদলীয় বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার রাজীব কুমার। এছাড়া ছিল কমিশনের ফুল বেঞ্চ। সেখানে আরভিএম নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা করেন তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি কিছু অযৌক্তিক প্রশ্ন তোলেন। বলেন, আগে তো ঠিক হোক কারা পরিযায়ী ভোটার? তারপর ভোট কীভাবে হবে তার সিদ্ধান্ত হবে। কিন্ত নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান ওড়িশার শাসক দল বিজু জনতা দলের এমপি অমর পট্টনায়ক। প্রাশ্চত্য শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষিত বিজু জনতা দলের শীর্ষ নেতা ও ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়ক। তিনি বরাবর রাজ্যে উন্নয়ন ও সুরক্ষায় উন্নত প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তার দলের নেতা, মন্ত্রী, ও জনপ্রতিনিধিরা বরাবরই তাঁর পথ অনুসরণ করে চলেন। সেজন্য তাঁর দলের পক্ষ থেকে সাংসদ অমর পট্টনায়কও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের এই উন্নত প্রযুক্তিকে সমর্থন করেছেন। কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি অবশ্য এই বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের ওপরই ছেড়ে দিয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হল, নির্বাচন কমিশন একটি স্বতন্ত্র সংস্থা। সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার অধিকার দিয়েছে দেশের সংবিধান। সেই সংস্থা যে পরিকল্পনা করে, তা সমস্ত দলমতের উর্দ্ধে উঠে দেশের যাবতীয় সুরক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা ভেবেই পদক্ষেপ করে। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার যাতে সুষ্ঠভাবে প্রয়োগ করা হয়, সেটা নিশ্চিত করেই নতুন প্রযুক্তির প্রচলন করা হয়। ইভিএম মেশিন নিয়ে যখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলি সংশয় প্রকাশ করেছিল, তখন কমিশন সমস্ত রাজনৈতিক দলের সামনে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্নভাবে ডেমো করে দেখিয়ে দিয়েছিল, এতে কারচুপি করা যায় না। নিশ্চয় তাঁরা এমন কোনও প্রযুক্তি ব্যবহার করবেন না, যাতে কারসাজি হতে পারে। সব কিছু খতিয়ে দেখে তবেই সেটি প্রয়োগের কথা ভাবে কমিশন। তৃণমূল নেতাদের যদি এবিষয়ে কোনও সংশয় থাকে, তাহলে তাঁরা নির্বাচন কমিশনের দেওয়া ন’টি পয়েন্টের ফিডব্যাক ফরম্যাট খতিয়ে দেখতে আগ্রহী হলেন না কেন? সেটা হাতে কলমে চাক্ষুষ করাতেই তো সর্বদলীয় বৈঠক ডেকেছিল কমিশন।

দ্বিতীয়ত কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় একজন নির্বাচনী জনপ্রতিনিধি। লকডাউনের সময় কাতারে কাতারে যখন এরাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকরা ঘরে ফিরছিল, তখন সেই পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর কেন্দ্রের দায়িত্ব নিয়ে তাঁর দল সবচেয়ে বেশি সরব হয়েছিল। তাহলে তিনি কি করে জানেন না এই রাজ্য থেকেই প্রতিদিন কত পরিযায়ী শ্রমিক ভিন রাজ্যে কাজ করতে যায়? নাকি এর পিছনে রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলির সার্বজনীন উদ্দেশ্য? রাজ্যের বাইরে থাকা ভোটাররা নাগালের বাইরে চলে গেলে তাঁদের ভোট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। বুথে অনুপস্থিত ভোটারদের ভোট রিগিং করলেও ধরা পড়ে যাবে। নির্বাচনের আগের দিন রাতে বিরোধী ভোটকে ধমকে চমকে বাগে আনা যাবে না। সেজন্যই কি আরভিএম নিয়ে এই বিরোধিতা?

Related posts

Leave a Comment